ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যক্তির গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকুক

ব্যক্তির গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকুক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:১৬ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০৫

মোবাইল ফোনের মধ্য দিয়া সরকারের নজরদারি বৃদ্ধির নূতন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগে সচেতন নাগরিক মহলে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হইয়াছে, উহা সংগত বলিয়াই আমরা মনে করি। শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যেমন বলা হইয়াছে, বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের এলাকাভিত্তিক অবস্থান জানা যায়। তবে নভেম্বরে আরম্ভ হইতে যাওয়া নূতন এক ব্যবস্থার মাধ্যমে ফোন ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা সম্ভব হইবে। অর্থাৎ উদ্দিষ্ট ব্যক্তি শুধু কোন এলাকায় আছেন, উহাই নহে; কোন ভবনে অবস্থান করিতেছেন উহাও সহজে জানা যাইবে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে সরাসরি এই তথ্য সংগ্রহ করিবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। নজরদারির নূতন এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হইয়াছে ‘ইন্টিগ্রেটেড লফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেম’ (আইএলআইএস বা সমন্বিত আইনসম্মত আড়ি পাতার ব্যবস্থা)। ইহার মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করিয়া অন্তত ছয় মাস সংরক্ষণ করা যাইবে। মোদ্দা কথা, নূতন ব্যবস্থায় অপরাধীর গতিবিধি নিখুঁতভাবে জানা যাইবে বিধায় উহা অপরাধ দমনে পূর্বের ব্যবস্থা অপেক্ষা অধিকতর সহায়ক হইবে। এই দিক হইতে ব্যবস্থাটি প্রচলনে আপত্তির কিছু নাই। কারণ সকলেই মানেন, অপরাধী যদি থাকে ডালে ডালে; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থাকিতে হয় পাতায় পাতায়, নচেৎ অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন দুরাশায় পরিণত হয়।


কিন্তু গোল বাধাইয়াছে এই প্রকার অতিস্পর্শকাতর প্রযুক্তি ব্যবহারের তিক্ত অভিজ্ঞতা। বিশেষত গত কয়েক বছরে হরহামেশা বিভিন্ন ব্যক্তির টেলিফোন কথোপকথন রেকর্ড করিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করার ঘটনা ঘটিয়াছে। ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনের এহেন অপরাধের শিকার হইয়াছেন প্রায় সর্বস্তরের মান্যগণ্য মানুষ। তথায় বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা বেশি থাকিলেও এমনকি শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীও রেহাই পান নাই। অর্থাৎ বিগত সময়ে আড়ি পাতার ব্যবস্থাটি শুধু বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয় নাই; অনেকাংশে গোষ্ঠীগত, এমনকি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার কর্মেও ব্যবহৃত হইয়াছে। তাই প্রশ্ন উঠিয়াছে, নজরদারির নূতন প্রযুক্তিও একই উদ্দেশ্যে ব্যহৃত হইবে কিনা? উপরন্তু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনে মোবাইল অপরেটররা গ্রাহকের বার্তা ও কথোপকথন নির্দিষ্ট সরকারি সংস্থাকে সরবরাহে বাধ্য হইলেও তথায় ব্যক্তির অবস্থানের তথ্য সরবরাহের বিষয়টি নাই। আমাদের সংবিধানও মানুষের গোপনীয়তার অধিকারের লঙ্ঘন অনুমোদন করে না।

আমরা জানি, জাতীয় নির্বাচনের ঘণ্টা বাজিল বলিয়া; নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তপশিল ঘোষণা হইবার কথা রহিয়াছে। নির্বাচন লইয়া ক্ষমতাসীনদের সহিত বিরোধীদের প্রবল মতবিরোধও দৃশ্যমান। ফলে নির্বাচনে বিরোধীদের কোণঠাসা করিয়া ফায়দা লোটার মানসে সরকার নূতন নজরদারি ব্যবস্থাটি চালু করিতেছে– এমন আশঙ্কা কেহ করিলে তাহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যাশা, আড়ি পাতার নূতন আয়োজন কার্যকর করিবার পূর্বে সরকার এই বিষয়ে নাগরিক মহলে সৃষ্ট সকল প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিবে এবং উহার যে কোনো অপপ্রয়োগ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা লইবে।

আরও পড়ুন

×