ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

বছর পেরোতেই 'নতুন প্রযুক্তির' বাঁধে ধস

বছর পেরোতেই 'নতুন প্রযুক্তির' বাঁধে ধস

মামুন রেজা ও শেখ হারুন অর রশীদ, কয়রা থেকে

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ২৩:১৭

খুলনার কয়রার হরিণখোলা বেড়িবাঁধের ধসে যাওয়া স্থানে গতকাল সকালে সংস্কার কাজ করছিলেন শতাধিক শ্রমিক। কেউ মূল বাঁধের ওপর ও নিচ থেকে মাটি সরাচ্ছেন, আবার কেউ ঝুড়িতে করে সেই মাটি নিয়ে ধসে যাওয়া বাঁধের স্থানে দিচ্ছেন।

এ সময় ২ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী ও রুহুল বারী শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র এক বছর আগে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। অথচ এরই মধ্যে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তারা বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় ওপরে এবং বাঁধের দুই পাশে মাটি দেওয়া হলেও ভেতরে বালু দেওয়া হয়। এ কারণে বাঁধ দুর্বল এবং এক বছরের মধ্যে ধসে গেছে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ভারি বৃষ্টি ও উঁচু জোয়ারের প্রভাবে খুলনার কয়রার হরিণখোলা গ্রামের 'নতুন প্রযুক্তির' বেড়িবাঁধের প্রায় ৮০ মিটার গত সোমবার সকালে ধসে যায়। রাত ৩টার দিকে সেই ধস আরও বাড়ে। এরপর মঙ্গলবার ভোর থেকে দিনভর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শতাধিক শ্রমিক কাজ করে বাঁধ সংস্কার করেন। তবে বাঁধ এখনও ঝুঁকিমুক্ত হয়নি।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জাইকার অর্থায়নে তারা ঠিকাদারের মাধ্যমে ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ২ নম্বর কয়রা গ্রামের খালের গোড়া থেকে গোবরা গ্রাম পর্যন্ত ৬০ মিটার ক্লোজার ও ১ হাজার ৬৪০ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করে। কপোতাক্ষ নদের তীরের এই কাজ শেষ হয় ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। নির্মাণকাজে খরচ হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। দুই পাশে মাটির দেয়াল ও মাঝখানে ড্রেন কেটে বালু ভরাট করে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়।

কয়রা গ্রামের রোকনুজ্জামান বলেন, বাঁধটি অনেক উঁচু ও প্রশস্ত হয়েছে। তবে বাঁধের দুই পাশ ও ওপরে মাটি দেওয়া হলেও ভেতরে দেওয়া হয়েছে বালু। পুরোটা মাটি দিয়ে করলে বাঁধে ধস নামত না। বাঁধ যাতে না ভাঙে, সে জন্য নদীর তীরে ব্লক দেওয়া দরকার।

গতকাল সকালে বাঁধ মেরামতের স্থানে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের যে স্থান ভেঙে গেছে, এর দু'পাশের মাটি সরে গিয়ে বালু বেরিয়ে গেছে। ওই বালু নদীর ঢেউ লেগে ধুয়ে যাচ্ছে। হরিণখোলা গ্রামের বাসিন্দা জিয়াদ শেখ বলেন, 'একে তো বালুর বাঁধ। তারপর এভাবে মূল বাঁধের মাটি কেটে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। এতে বাঁধের বড় অংশ ফের ঝুঁকিতে পড়বে।'

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম শেখ বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে বাঁধের ওই স্থান ভেঙে গিয়েছিল। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার বাঁধ। সে সময় পাউবো ওই বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়। তবে সঠিক তদারকি না থাকায় কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অপরিকল্পিতভাবে বাঁধটি নির্মাণ করে। ফলে বছর না যেতেই বাঁধটি ভাঙনের শঙ্কার মুখে পড়ে। তিনি বলেন, বাঁধের ভেতরে যদি বালু দেওয়া না হতো, তাহলে এ অবস্থা হতো না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এক বছর আগে বাঁধটি বালু ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। সে সময় নির্মাণকারীরা মূল বাঁধের পাশের নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তুলেছেন। পরে বাঁধের দুই পাশের ঢালে চরের মাটি দিয়ে বালু ঢেকে দেওয়া হয়।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, জাইকার অর্থায়নে ভিন্ন ডিজাইনে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির সংকট থাকায় প্রথমে বাঁধের মাঝের স্থানে ড্রেন কেটে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। পরে দুই পাশে মাটির দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এটি 'নতুন প্রযুক্তি'। আগামীতে এ প্রযুক্তিতেই সব বাঁধ নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি। মূল বাঁধ কেটে ধসে যাওয়া স্থান মেরামত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জরুরি মুহূর্তে মাটি না পাওয়ায় এভাবে করা হচ্ছে। জোয়ারের প্রভাব কমলে নদীর চরের মাটি কেটে সব বাঁধ ঠিক করা হবে। তবে পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফি উদ্দিন বলেন, বাঁধের মধ্যে বালু দেওয়া হয়নি। বাঁধ তৈরির সময় আশপাশ থেকে মাটি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বালু মাটি থাকতে পারে। ২-৩ কিলোমিটার দূর থেকে মাটি আনতে গেলে বাঁধের নির্মাণ খরচ অনেক বেশি হতো। এ ছাড়া যে স্থানে ধস নেমেছে, সেটি মূলত নদীভাঙন কবলিত।

আরও পড়ুন

×