দীর্ঘদিনেও আলোর মুখ দেখেনি রাবার ড্যাম
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শেরপুরের পাহাড়ি জনপদ সিঙ্গাবরুনা, রানীশিমুল ও কাংশা ইউনিয়নের মানুষের দুঃখ সোমেশ্বরী নদী। প্রতিবছর উজানের ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নাঞ্চলের বসতভিটা, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। বর্ষার কয়েকমাস বাদ দিলে নদীটি কৃষকের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারতো। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নদীটির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। অথচ ঝিনাইগাতীর নলকুড়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মহারশি নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণে বদলে গেছে ওই এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারো পাহাড়ের নকরেক রেঞ্জ বা সীমসাংগ্রী এলাকা থেকে সোমেশ্বরী নদীর উৎপত্তি। নদীটি শেরপুরের শ্রীবরদীর খারামুড়া ও বালিজুড়ি হয়ে ঝিনাইগাতীর কাংশা, ধানশাইল দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশ স্বাধীনের আগে থেকে ওই দুই উপজেলার সোমেশ্বরী নদীপারের গ্রামগুলো দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। চাষাবাদ ও সুপেয় পানির জন্য গ্রামের মানুষ নদীর ওপর নির্ভর করতেন। রানীশিমুল ইউনিয়নের বালিজুড়ি এলাকায় নদীতে এক সময় বাঁধ নির্মাণ করে উজানের প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার একর জমিতে চাষাবাদ করা হতো। কিন্তু এতে বিপদে পড়েন ভাটি এলাকার মানুষ। স্বাধীনতার পর বিষয়টি নিয়ে দুই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও ঘটে। ঝিনাইগাতীর প্রবীণ শিক্ষক অনন্ত রায় বলেন, এক সময় সেচের পানির জন্য নদীতে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বেশ কয়েকটি এলাকায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে। মামলা-মোকদ্দমায় দরিদ্র মানুষ পথে বসেছে।
স্থানীয়রা জানান, ২০০০ সালে তৎকালীন সরকার চার কোটি টাকা ব্যয়ে কাংশা ইউনিয়নের আয়নাপুর গ্রামে সোমেশ্বরী নদীর ওপর একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। লক্ষ্য ছিল নদীর পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহার করে বোরো ও সবজির চাষ সম্প্রসারণ করা। কিন্তু ঢলের তোড়ে ২০০১ সালে ভেঙে যায় বাঁধটি। ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও ভুল জায়গায় নির্মাণ করায় বাঁধটি বিলীন হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর উজানের লোকজন ফের নদীতে বাঁধ দিয়ে চাষাবাদের পানি সংগ্রহ শুরু করলে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৫ বছর।
স্থানীয় কৃষকরা তাওয়াকুচা এলাকায় সোমেশ্বরী নদীতে নতুন করে রাবার ড্যাম নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে দুই উপজেলার ১০-১২ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ সংকট কিছুতে স্বাভাবিক হচ্ছে না। নদীপারের ১০-১২টি গ্রামের কৃষিজীবী পরিবারের ভাগ্যের চাকা থমকে গেছে। যদিও স্থানীয় কৃষকরা গভীর নলকূপ থেকে পানি কিনে কিছু জমি চাষের আওতায় নিয়ে এসেছেন। তবে অধিক খরচে পানি কিনে চাষাবাদে পোষাচ্ছে না। অথচ পাশের মহারশি নদী তীরবর্তী এলাকায় রাবার ড্যামের পানিতে সারা বছর চাষাবাদ করা হচ্ছে। এতে নলকুড়া ইউনিয়নের বড় রাংটিয়া, সন্ধ্যাকুড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকদের ভাগ্য বদলে গেছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় গুরুচরণ দুধনই গ্রামের কৃষক হযরত আলী ও আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তারা বলেন, তাদের দুর্ভাগ্য হাতের কাছে নদীর পানি থাকার পরও উচ্চমূল্যে গভীর নলকূপের পানি কিনে চাষাবাদ করতে হচ্ছে। এতে কিছু ফসল হলেও তাদের পোষাচ্ছে না। তারা জানান, শুকনো মৌসুমে পাহাড়ি এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এ সময় কোনো ফসল চাষ করতে পারেন না তারা। রাবার ড্যাম হলে শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কাজে লাগিয়ে চাষাবাদ করতে পারতেন।
আয়নাপুর গ্রামের বাসিন্দা শাজাহান মিয়া বলেন, যে রাবার ড্যামটি চার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেটির স্থান নির্ধারণ সঠিক ছিল না। তাই উজানের ঢলে বাঁধটি বিধ্বস্ত হয়। তাওয়াকুচা এলাকায় একটি বাঁধ হলে এটি ঠিক থাকবে এবং সারা বছর পানি পাওয়া যাবে।
বালিজুরি গ্রামের কৃষক গোলাপ হোসেন, সোহরাব আলী, আব্বাস আলী ও নূর ইসলাম জানান, বোরো মৌসুমে এক একর জমিতে সেচ দিতে গভীর নলকূপের মালিককে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। অথচ মহারশির রাবার ড্যাম থেকে এক একর জমির পানি দিতে কৃষকদের গুনতে হয় অর্ধেকের চেয়েও কম টাকা।
মহারশি নদী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদের ভাষ্য– তাদের সমিতির কৃষক সদস্য এক হাজার ২০০। এক একর জমিতে তারা সেচের পানি বিক্রি করেন মাত্র তিন হাজার টাকায়। তিনি বলেন, সোমেশ্বরী নদীপারের মানুষ আসলে চাষাবাদ করতে অনেক কষ্ট করছেন। আমাদের চেয়ে তাদের দ্বিগুণ আবার কখনও তিনগুণ টাকা দিয়ে পানি কিনতে হয়। সেখানে রাবার ড্যাম হলে ৮-১০টি গ্রামের কৃষক উপকৃত হতেন।
শেরপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্যমতে, ২০১০ সালে সোমেশ্বরী নদীর ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচা এলাকায় জাইকা প্রকল্পের আওতায় নতুন একটি রাবার ড্যাম নির্মাণের প্রস্তাব পাঠায় এলজিইডি। কিন্তু সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০১৫ সালে কৃষকরা রাবার ড্যামের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে এলজিইডি একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে ফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সালে ওই নদীতে আরও তিনটি রাবার ড্যাম নির্মাণের প্রকল্প তৈরি করে অধিদপ্তরে পাঠানো হলেও কার্যকর হয়নি। ফলে ২০১৯ সালের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার কৃষকরা সোমেশ্বরী নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন করে হতাশ হয়ে পড়েন।
শ্রীবরদীর রানীশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সোহাগ জানান, সোমেশ্বরী নদীতে শ্রীবরদীর বালিজুড়ি অংশে একটি রাবার ড্যাম নির্মাণের দাবি কৃষকদের। বর্তমান সরকার দাবি পূরণে পদক্ষেপ নেবে বলে আশা তাদের।
ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এবং ধানশাইল ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, এই জনপদে পানির স্তর দিন দিন নেমে যাচ্ছে। গভীর নলকূপের পানি অপচয় হয়। অথচ নদীর পানি ধরে রাখতে পারলে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হবে।
এলজিইডির ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রকৌশলী অনতু বলের ভাষ্য– রাবার ড্যামের জন্য এরআগে জাইকাসহ যেসব প্রকল্প পাঠানো হয়েছে সেগুলো স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরামর্শ করে আবার নতুন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন জানান, ঝিনাইগাতী পাহাড়ি এলাকাটি খরাপ্রবণ। শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না। মহারশি নদীতে যে রাবার ড্যামটি হয়েছে সেখানে পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে ধান, গম, সরিষা, ভুট্টা চাষাবাদ করা হচ্ছে। সহজে কম খরচে পানি পায় কৃষক। কিন্তু সোমেশ্বরী নদীপারের মানুষ সহজলভ্য পানি না পাওয়ায় প্রতি মৌসুমে ৮-১০ হাজার কৃষকের সেচকাজ ব্যাহত হয়। রাবার ড্যাম হলে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে এবং পাহাড়ি এলাকায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
- বিষয় :
- নদী