ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন সপ্তাহের ঘরেই লেপার্ড দুটির কেটে গেল ৯ বছর!

তিন সপ্তাহের ঘরেই লেপার্ড দুটির কেটে গেল ৯ বছর!
×

গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন শেডে ৯ বছর ধরে আছে লেপার্ড দুটি। সম্প্রতি তোলা সমকাল

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

তাদের বয়স তখন দেড় মাস, পৃথিবীটা ছিল অচেনা। উদ্ধারের পর আশ্রয় মিলেছিল গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন শেডে। কথা ছিল, রোগের ঝুঁকি এড়াতে কয়েক সপ্তাহ আলাদা রাখা হবে। তারপর মিলবে বড় পরিসর, স্বাভাবিক পরিবেশ। কিন্তু সেই ‘কয়েক সপ্তাহ’ আর শেষ হয়নি।
দেড় মাস বয়সী যে দুই লেপার্ডকে কোয়ারেন্টাইনের জন্য আনা হয়েছিল, প্রায় ৯ বছর পরও তাদের ঠিকানা সেই ছোট্ট ঘর। লোহার গ্রিলঘেরা সীমিত পরিসরেই কাটছে তাদের দিন-রাত। সেখানে নেই গাছে ওঠার ব্যবস্থা, নেই দৌড়ে বেড়ানোর জায়গা, নেই শিকার ধরার মতো কোনো পরিবেশ। এমনকি সাফারি পার্কে আসা দর্শনার্থীদেরও তাদের দেখার সুযোগ নেই। বন্যপ্রাণীর জন্য সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসেবে তৈরি কোয়ারেন্টাইন শেডই যেন দুই লেপার্ডের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেছে।

বন বিভাগ সূত্র বলছে, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকায় একটি গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করে পুলিশ। বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগে ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়। পরে চারটি শাবকই পাঠানো হয় গাজীপুর সাফারি পার্কে। তখন লেপার্ড দুটির বয়স ছিল দেড় মাস। একটির ওজন ছিল দুই কেজি, অন্যটির এক কেজি ৬০০ গ্রাম। লেজসহ তাদের দৈর্ঘ্য ছিল ২৬ ও ২২ ইঞ্চি। নিয়ম অনুযায়ী নতুন আনা প্রাণীগুলোকে রোগজীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষায় কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। সেই নিয়মেই দুই লেপার্ড শাবককে কোয়ারেন্টাইন শেডে রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে থাকা সিংহশাবক দুটিকে পরে সাফারি পার্কের নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হলেও লেপার্ড দুটির ভাগ্যে আর পরিবর্তন আসেনি।
সময় গড়িয়েছে। শাবক দুটি বড় হয়েছে। অথচ বদলায়নি তাদের থাকার জায়গা। সাফারি পার্কের কোয়ারেন্টাইন শেডে গিয়ে দেখা যায়, দুই লেপার্ড এখনও পাশাপাশি থাকা দুটি ছোট কক্ষেই রয়েছে। খাবার দেওয়ার সময় তাদের একেকটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। খাবার শেষ হলে দরজা খুলে দেওয়া হয়। তখন তারা দুই কক্ষের মধ্যে ঘোরাফেরা করে খাবার খুঁজে খায়। শেডের আশপাশে কেউ গেলেই আচরণে দেখা যায় অস্থিরতা। মানুষ দেখলে গ্রিলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। সীমিত জায়গার কারণে স্বাভাবিকভাবে ছুটে চলা, লাফানো কিংবা উঁচুতে ওঠার সুযোগও নেই। পার্কে আসা দর্শনার্থী বাঘ ও সিংহ দেখার সুযোগ পেলেও লেপার্ডের দেখা পান না। তাদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হলে দর্শনার্থীরাও এই প্রাণী দেখার সুযোগ পাবেন। তবে দর্শনার্থীদের দেখানোর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই লেপার্ডের জীবনযাপন। প্রায় ৯ বছর ধরে তাদের এমন জায়গায় কেন রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও কল্যাণ দুটোই ব্যাহত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রাণীকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার যে উদ্দেশ্য সেটা তো লম্বা সময় রাখার কথা নয়। বছরের পর বছর কোয়ারেন্টাইনে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের উপযুক্ত পরিবেশে রাখা উচিত।
গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী সমকালকে বলেন, উচ্চপর্যায়ের কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় লেপার্ড দুটি এই দীর্ঘ সময় কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল স্থানটি পরিদর্শন করেছে। তারা প্রতিবেদন দেবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 
লেপার্ড দুটি এত বছর কোয়ারেন্টিন শেডে থাকলেও সেগুলোকে স্থানান্তরে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে জানান তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়েছিল কিনা তা তিনি জানাতে পারেননি।

আরও পড়ুন

×