শিক্ষার্থী নেই, খালি ক্লাসরুম অফিস কক্ষে আড্ডায় শিক্ষকরা
সহপাঠীরা আসেনি, তাই একা বসে আছে শিক্ষার্থী। নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসা। ছবি: সমকাল
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৭ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮
‘কোনো ছাত্রী আসে না, প্রতিদিন একাই আসি আর ঘুরে যাই। ক্লাসে ১১ জন ছাত্রী ভর্তি থাকলেও কেউ আসে না। বাবা-মায়ের চাপে বাধ্য হয়ে আসি। এটাকে কি মাদ্রাসা বলে?’– হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিল কুড়িগ্রামের উলিপুরের নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আঁখি মনি। একই অভিযোগ অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফীর। তার ভাষ্য, ভর্তি হয়ে তাদের জীবনটা মাটি হয়ে গেছে।
৩১ আগস্ট দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতায় ঢাকা পুরো মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। মাঠে হাঁটু সমান ঘাস, নেই কোনো শিক্ষার্থীর কোলাহল। বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে মাত্র তিনটি মেয়ে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, শিক্ষক ক্লাসে না আসায় তারা খেলাধুলা করছে। অন্যদিকে অফিস কক্ষে দেখা মেলে ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষকের– যারা আড্ডায় মশগুল।
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় মোট শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ১৫৭ জন এবং ৯৬ জন উপবৃত্তি পান। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুরো প্রতিষ্ঠানে গড়ে ১০ জন শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকে না। কয়েক লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব অপচয়ের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীরা শুধু বেতন পকেটে পুরছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছাত্রী নেই, তবুও বছরের পর বছর এই প্রতিষ্ঠান চলে কীভাবে? শিক্ষকরাও ঠিকমতো আসেন না। অনিয়ম তদন্ত করে এটি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।’
দাখিল পর্যায়ে অন্তত ১০টি কক্ষ থাকার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিতে কক্ষ মাত্র পাঁচটি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি (ইবতেদায়ি) শাখার কোনো শ্রেণিকক্ষ কিংবা শিক্ষার্থী না থাকলেও সেখানে চারজন শিক্ষক নিয়মিত কয়েক বছর ধরে পূর্ণ সরকারি বেতন তুলে যাচ্ছেন।
শিক্ষা পরিপত্র অনুযায়ী দাখিল পরীক্ষায় প্রতি বছর অন্তত ১১ জন শিক্ষার্থী পাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরপর তিন বছর নির্ধারিত সংখ্যার কম পাস করলে বেতন-ভাতা স্থগিত করার নিয়ম। অথচ ২০২৩ সালে এ মাদ্রাসা থেকে পাস করেছে পাঁচজন, ২০২৪ সালে তিনজন এবং ২০২৫ সালে পাস করেছে মাত্র চারজন। আইন তোয়াক্কা না করে নিয়মিত উত্তোলন করা হচ্ছে সরকারি টাকা।
মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য আকবর আলীর সরল স্বীকারোক্তি, ‘আইনকানুন বুঝি না, মিটিংয়ে শুধু সই দিই। এখানে তো দেখছি ছাত্রীর চেয়ে শিক্ষক বেশি।’
শিক্ষার্থী শূন্যতার বিষয়টি স্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. আব্দুল গফ্ফার বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। বাল্যবিবাহের কারণে উপস্থিতি কম। হোম ভিজিট করেও ছাত্রী আনা যাচ্ছে না।’ তবে ইবতেদায়ি শাখায় শিক্ষার্থী ছাড়া শিক্ষক থাকার বিষয়ে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি (সাবেক সুপার) মোহাম্মদ আলী জানান, বিল বন্ধ করার এখতিয়ার তাঁর নেই।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গুরুতর এই অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত পরিদর্শন করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম আরিফ বলেন, ‘অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- কুড়িগ্রাম