৮ কোম্পানির সারে ভেজাল প্রত্যাহারের নির্দেশ
মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাটুরিয়ার বাজারে বিক্রি হওয়া ৮টি কোম্পানির সারে ভেজাল পেয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। এরপর এসব সার বাজার থেকে দ্রুত তুলে নিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছে সাটুরিয়া কৃষি অফিস।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সাটুরিয়া উপজেলার কয়েকটি সার ও কীটনাশকের দোকান থেকে ১৬টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয় পরীক্ষার জন্য। গত ৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। এতে ৮টি কোম্পানির উৎপাদিত সারে ভেজাল ধরা পড়ে।
নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয় চরতিল্লির গ্রামের আলমগীর ট্রেডার্স নামের দুটি দোকান, চর সাটুরিয়ার আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি দোকান, দরগ্রামের কুষ্টিয়া বাজারের বারী এন্টারপ্রাইজ, বালিয়াটি বাজারের আরিফ এন্টারপ্রাইজ ও পুলক টেড্রার্সসহ ৯টি দোকান থেকে।
ভেজাল শনাক্ত হওয়া কোম্পানি ও পণ্যের নাম হলো– ব্যাবিলন এগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের ব্যাবিলন বোরন সার, ব্যাবিলন এগ্রিসায়েন্স লিমিটেডের ব্যাবিলন জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট, নিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নিড সলুবোর, এগ্রো মাইন লিমিটেডের সলিড জিংক মনো, হোসেন এন্টারপ্রাইজের বিজয় জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট, ডেলকো এগ্রোর মনো জিংক সালফেট এবং গ্রিন বাংলা এগ্রোভেটের জিবি জিংক মনোহাইড্রেট।
সূত্রমতে, সাটুরিয়ার উপজেলায় ৩৭ হাজার ৪৭৪ জন কৃষক আছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকরা তাদের ধান, পাট ও আলু, কপিসহ বিভিন্ন সবজিতে এসব সার ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে এতদিন ধরে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কোম্পানির বাজারজাতকৃত কৃষিপণ্যের সরকারি নির্দেশনার তুলনায় কার্যকরী ক্ষমতা অনেক কম। গবেষণার প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব কৃষিপণ্য ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত করে সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে বাজার থেকে এসব ভেজাল কৃষিপণ্য দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম ওইসব কোম্পানিকে দ্রুত ভেজাল সার বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য চিঠি দেন। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন বিএডিসির ডিলারের কাছেও এসব ভেজাল পণ্য পাওয়া গেছে। তাদের দ্রুত সারগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব ডিলার এতদিন কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান কৃষি কর্মকর্তা।
বালিয়াটি গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার প্রজেক্টে প্রায় তিনশত বিঘা জমিতে আবাদ হয়ে থাকে। কিন্তু ফসল ফলাতে গিয়ে নানা ধরনের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে আগের মতো উপকার পাই না। এ বিষয়ে কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কোম্পানির সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তাদের কথামতো সেগুলো ব্যবহার করেও কোনো ফল পাই না।
রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত সাটুরিয়ার কৃষক আ.খ.ম নূরুল হক বলেন, সাটুরিয়ার হরগজ ইউনিয়নে প্রথমে ফুলকপি চাষ করি আমি। আমার দেখাদেখি করে সবাই এখন ফুলকপি, বাঁধাকপি ও আলু চাষ করেন। তখনকার সারগুলো ভালো কাজ করত। এখন যে সারগুলো বাজারে পাওয়া যায় তা দিয়ে কৃষকের কোনো উপকারে আসে না। ভেজাল সার ব্যবহার করে কৃষকরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম বলেন, ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন কোম্পানির ১৬টি নমুনা (সার) সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এতে ৮টি কোম্পানির সার সরকারি নির্দেশনার চেয়েও অনেক কম কার্যকরী ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে নমুনাগুলো সার ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৬ এর ১৭ (২) ঘ উপধারা মোতাবেক ভেজাল সার। এসব সার মজুত, ক্রয়-বিক্রয় সার আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযুক্ত কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে তাদের পণ্য জরুরি ভিত্তিতে বাজার থেকে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের এসব সার ব্যবহারে ব্লক সুপারভাইজারদের পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে কোনটি আসল, কোনটি নকল বা ভেজাল– তা পরীক্ষা ছাড়া বলার উপায় নেই।
সাটুরিয়ার ইউএনও কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ভেজাল সারের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের ডিলারশিপও বাতিল করা হতে পারে।
- বিষয় :
- ভেজাল পণ্য