ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চার দিনে দুই বনের ৯০০ গাছ চুরি

চার দিনে দুই বনের ৯০০ গাছ চুরি
×

তালতলীর নলবুনিয়া থেকে কেটে নেওয়ার পর পড়ে থাকা গাছের গোড়া , টেংরাগিরি বনাঞ্চলে পড়ে থাকা গাছের গোড়া। বুধবার তোলা সমকাল

 আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৬ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় যে টেংরাগিরি বন, সেই বনের মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করছে দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি চার দিনে এই সংরক্ষিত বনের প্রায় ৯০০ প্রজাতির গাছ কেটে নিয়েছে তারা। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারাই এই দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের গাছ চুরির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। 

টেংরাগিরি বনটি পড়েছে বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে। বন বিভাগের হিসাবে যার আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। এক সময় এই অঞ্চল ছিল সুন্দরবনের অংশ। ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষিত হয় এই অঞ্চলটি। ১৯৬৭ সালে নামকরণ করা হয় টেংরাগিরি বনাঞ্চল হিসেবে। এই বনের প্রধান গাছের মধ্যে রয়েছে– গেওয়া, জাম, ধুন্দল, কেওড়া, সুন্দরী, বাইন, করমচা, কেওয়া, তাল, কাঁকড়া, বনকাঁঠাল, রেইনট্রি, হেতাল, তাম্বুলকাটা ও গরান। এখানে বিচরণ করে কাঠবিড়ালি, বানর, সজারু, বুনো শূকর, কচ্ছপ, শিয়াল, বনমোরগ, ৪০ প্রজাতির সাপসহ বেশ কিছু প্রাণী। 

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে টেংরাগিরি বনাঞ্চল ও প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন নলবুনিয়া বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা শুরু করে দুর্বৃত্তরা। গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুই এলাকা থেকে প্রায় ৯০০ গাছ কাটা হয়েছে। এর মধ্যে টেংরাগিরি থেকেই কাটা হয় ৪০০ গাছ। শুভসন্ধ্যা এলাকা থেকে কাটা হয় প্রায় ৫০০ গাছ। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে রেইনট্রি, কেওড়া, গেওয়া, ঝাউ ও জিলাপি। 

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত, বাবুল হাওলাদারসহ কয়েকজনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বৃত্তরা চুরি করে গাছ কেটে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই বন বিভাগের কর্মকর্তারা হুমকি দেন, তাদের বিরুদ্ধে গাছ কাটার মামলা দেবেন। এই ভয়ে তারা চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখলেও প্রতিবাদের সাহস পান না। 
এসব অভিযোগের সত্যতা মেলে সোনাকাটা ইউপির চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চুর কথায়। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ‘গাছ কাটার সঙ্গে বন বিভাগের লোকজন জড়িত। তারা জড়িত না থাকলে এতদিন বসে চোরেরা গাছ কাটে, আর তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি?’ তিনি এভাবে গাছ কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান। 

এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্যমতে, দুর্বৃত্ত চক্রের সদস্যরা রাতের আঁধারে সাধারণত কাঠ পাচার করে। অনেক সময় গাছ কেটে বনের ভেতরে ফেলে রাখে। পরে সুবিধাজনক সময়ে সরিয়ে নেয়। এমনকি তারা চুরির প্রমাণ মুছে ফেলতে গাছের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলে।

এ বিষয়ে বন বিভাগের নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওন দাবি করেন, ‘গাছ কাটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ তিনি আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। 
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান জানান, তারা তথ্য পেয়েছেন– চার দিনে টেংরাগিরি ও নলবুনিয়ার বন থেকে ৯ শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এই বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাতের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হয়ে মানুষকে রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়বে। তাঁর ভাষ্য, বনের কাঁকড়া, গুইসাপ, বন্য শূকরসহ নানা প্রাণী শিকারের অভিযোগও পেয়েছেন। বন বিভাগের লোকজন বিষয়টি জানলেও তারা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, তারা অভিযোগ পাওয়ার পর সরেজমিন অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছেন। এ ঘটনায় মামলাও করেছেন।

তদন্তে কমিটি গঠন
গাছ কাটার অভিযোগ পাওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার। এতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মোহাম্মদ ইলিয়াসকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) তদন্ত কমিটির চিঠি পেয়েছি। আগামী সপ্তাহে তদন্ত শুরু করব।’
ইউএনও অতীশ সরকার বলেন, ‘টেংরাগিরি ও নলবুনিয়া বনের গাছ কাটার খবর পেয়ে পাঁচজনকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদের দেওয়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×