ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ

৭৩ লাখ টাকার এসি চালাতে ৭ কোটির সাবস্টেশনের প্রস্তাব

৭৩ লাখ টাকার এসি চালাতে ৭ কোটির সাবস্টেশনের প্রস্তাব
×

 লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে (শজিমেক) তিন গ্যালারিতে ২৪টি এসি বসানো হয়েছে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫২০ টাকা ব্যয়ে। তবে আসল চমক তৈরি হয়েছে এই এসি সচল করার পরিকল্পনা নিয়ে। এসিগুলো চালাতে বিদ্যুতের বাড়তি লোড জোগাতে গণপূর্ত অধিদপ্তর তিন হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার এক বিশাল নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৪১ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কলেজে আগে থেকে ৫০০ কিলোওয়াটের সাবস্টেশন চালু আছে। তার সঙ্গে ৫০০ কিলোওয়াট যুক্ত করলে গ্যালারির নতুন এসিগুলো অনায়াসে চালু করা সম্ভব, সেখানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সাড়ে ৬ গুণ বেশি ক্ষমতার এবং এসি স্থাপনের ব্যয়ের চেয়ে ৯ গুণ বেশি বাজেটের সাবস্টেশন প্রস্তাব করা হয়েছে।
বগুড়া বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতা বাড়ালে এই লোড সামলানো যেত। বিশাল ক্ষমতার নতুন সাবস্টেশন প্রস্তাবের আগে সঠিক লোড বণ্টন হিসাব করা উচিত ছিল। এতে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় ছাড়া আর কোনো লাভ হবে না। কলেজের শিক্ষকরাও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ৩ হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন চাওয়াকে অযৌক্তিক বলেছেন।

অনিয়মের চিত্র কেবল সাবস্টেশনে সীমাবদ্ধ নয়; কলেজের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ প্রকল্পের জেনারেটর সরবরাহেও ঘটেছে গুরুতর জালিয়াতি। গণপূর্তের ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) দরপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার জেনারেটর দেওয়ার কথা ছিল, যার বরাদ্দ ছিল ৯ লাখ টাকা। বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১২০ কেভিএ জেনারেটর। অর্থাৎ নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে ১৩০ কেভিএ কম ক্ষমতার জেনারেটর বসিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, চুক্তির শর্তে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি জেনারেটরের স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও সেখানে বসানো হয়েছে চীনে তৈরি জেনারেটর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই মাল্টিপারপাস হলের কাজ শেষ হলেও এমন জালিয়াতির কারণে এখনও ভবন হস্তান্তর হয়নি।
ই-জিপি শর্ত অনুযায়ী কেন কম ক্ষমতার এবং চীনে তৈরি জেনারেটর সরবরাহ করা হলো–এ বিষয়ে জানতে মেসার্স মাসুমা বেগম (জেভি)-এর স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। 

এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে গত ১৫ জুলাই গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন শজিমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াদুদুল হক তরফদার। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, ২৩ জুন নতুন সাবস্টেশনের এস্টিমেট অনুমোদনের জন্য যখন পাঠানো হয়, তখন তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি; বরং পরে ওই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। অধ্যক্ষ স্পষ্ট জানান, প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সিল দেখে বুঝে নিতে হয়। কিন্তু যে অনিয়ম হয়েছে, তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে।
অন্যদিকে, গণপূর্তের বর্তমান কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হক বলেন, ‘আমি বগুড়ায় যোগ দিয়েছি তিন মাস হলো। এসি স্থাপন, জেনারেটর সরবরাহ বা সাবস্টেশন প্রস্তাবের  প্রাক্কলন পূর্ববর্তী কর্মকর্তারা করে গেছেন। তাই এই মুহূর্তে ব্যাখ্যা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতের দূরদর্শী বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনা করে হয়তো এই সাবস্টেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ৭৩ লাখ টাকার এসির জন্য পৌনে সাত কোটি টাকার সাবস্টেশন প্রস্তাব এবং আমদানীকৃত জেনারেটরের চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়টি কারিগরি কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত। এতে সত্যতা মিললে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×