শাহি ঈদগাহ মাঠে বারবার মেলা, ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা
সিলেট নগরীর শাহি ঈদগাহ মাঠে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি হিসেবে মাঠে রাখা হয়েছে বাঁশসহ স্টল নির্মাণ সামগ্রী। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহি ঈদগাহ মাঠ এখন পরিণত হয়েছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। একটির পর একটি মেলার ভারে ধুঁকতে থাকা এই মাঠ ঘিরে এবার একযোগে রাস্তায় নেমেছেন ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও অভিভাবকরা। তাদের দাবি– মাঠ বাঁচাও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহি ঈদগাহ মাঠ বছরের পর বছর ধরে মেলার সরঞ্জামে ঠাসা থাকায় খেলাধুলার কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট নেই। আগের মেলাগুলোর ফেলে যাওয়া আবর্জনা এখনও মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যে মাঠ শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদনের জায়গা হওয়ার কথা, বারবার মেলার দখলে গিয়ে সেই তরুণ প্রজন্মকে বিপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ১০ অক্টোবর সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে শুরু হতে যাচ্ছে মাসব্যাপী ‘সৃজনশীল পণ্য প্রদর্শনী, শিল্প-পণ্য ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬’। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে এই মেলার ঘোষণা দেন চেম্বারের সভাপতি লুবাবা ইয়াসমিন সম্পা। কিন্তু ঘোষণার পরপরই একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ জামাল কোরেশী বলেন, আমাদের এলাকায় খেলার মাঠ বলতে একটাই– শাহি ঈদগাহ খেলার মাঠ। এই মাঠে আগে আমরা খেলতাম। এখন এটাকে সবাই চেনে মেলার মাঠ হিসাবে। প্রতি বছর একবার মেলা হলে মেনে নেওয়া যেত। যখন তখন মেলা এটি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর অর্থনৈতিক মন্দার এই কঠিন সময়ে নতুন মেলাকে স্থানীয় ব্যবসার জন্য সরাসরি ‘মরণফাঁদ’ আখ্যা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত বুধবার রাতে নগরীর বারুতখানা একটি রেস্তোরাঁয় জরুরি বৈঠকে বসে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখা ও সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদ। সমিতির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান রিপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দোকান ভাড়া আর কর্মচারীদের বেতন জোগাড় করতে যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন একের পর এক মেলা স্থানীয় বাণিজ্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
দুই ব্যবসায়ী সংগঠনের সভা থেকে আগামী রোববার জেলা প্রশাসক ও এসএমপি কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না হলে সরাসরি ধর্মঘটে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা। ওই সভা থেকে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
ব্যবসায়ীদের এই আন্দোলন ও দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসএমসিসিআই)। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। সারা বছর চড়া কর, ভ্যাট ও বিদ্যুৎ বিল গুনে ব্যবসা চালানো ব্যবসায়ীরা এসব স্বল্পমেয়াদি মেলার কারণে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সময়ে অপ্রয়োজনীয় মেলা জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় অবকাঠামোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, পৃথক পৃথক মেলার সিদ্ধান্ত পরিহার করে সিলেট চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার ও উইমেন চেম্বার মিলে যৌথভাবে বছরে শুধু একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা উচিত, যা প্রচলিত বাণিজ্য নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মেলা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবাবা ইয়াসমিন সম্পা বলেন, ‘সারা দেশেই মেলার আয়োজন হচ্ছে, কিন্তু কেবল সিলেটে মেলা হলে সমস্যা তৈরি করা হয়। আমরা নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। মেলা আয়োজনের জন্য আগে মাঠ যাচাইয়ের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। পরে চেম্বার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নিজ উদ্যোগে মেলার সিদ্ধান্ত হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাউকেই মেলার ইজারা দেওয়া হয়নি।
এ ব্যপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে জানান, উইমেন চেম্বারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম মেনে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে মেলা নিয়ে এখনও তাঁর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি বলে জানান তিনি।
- বিষয় :
- মেলা