মধুপুরে ৩৫ লাখ সরকারি পাঠ্যবই বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন
মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধুপুরে ভাঙারি ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে এক টন পাঠ্যবই জব্দের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নৈশপ্রহরী ও ভাঙারি ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। মূল হোতাদের আড়ালের চেষ্টা চলছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। সেই সঙ্গে সরকারি পাঠ্যবই কেলেঙ্কারির ঘটনায় আরও বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের চাহিদা মোতাবেক সরকার প্রতি বছর বিনামূল্যের বই সরবরাহ করে। পরে শিক্ষা অফিস থেকে পাঠ্যবই নিয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতি বছর শিক্ষা অফিস অক্টোবর-নভেম্বরে পৌনে চার থেকে সাড়ে চার লাখ বইয়ের চাহিদাপত্র পাঠায়। বরাদ্দ পাওয়া দুই থেকে আড়াই লাখ বই জুন পর্যন্ত বিতরণ হয়। অবশিষ্ট বই স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুদামে রাখা হয়। গত শিক্ষা বর্ষের জন্যও প্রায় চার লাখ বইয়ের চাহিদাপত্র পাঠানো হয় এবং পুরো বই বরাদ্দ আসে। গত জুন পর্যন্ত পৌনে দুই লাখ বই বিতরণ হয়। অবশিষ্ট সোয়া দুই লাখ বই গুদামজাত ছিল। এসব বই এখন চোরাই পথে বিক্রি হচ্ছে। চোরাই বইয়ের একটি চালান গত বুধবার নরকোনা গ্রামে জনতার হাতে ধরা পড়ে। এই ঘটনায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নৈশপ্রহরী তোফায়েল আহমেদ এবং ভাঙারি ব্যবসায়ী ইব্রাহীম হোসেনকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মধুপুর থানার ওসি এ কে এম ফজলুল হক।
কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, বই বিতরণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। দীর্ঘদিন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা না থাকায় একাডেমিক সুপারভাইজার মহিউদ্দীন আহমেদ দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। তিনি বাড়তি চাহিদাপত্র দেখিয়ে অতিরিক্ত বই আনেন। বিলি করার পর অবশিষ্ট লাখ লাখ বই গুদামজাত করে রাখেন। সুযোগ বুঝে নৈশপ্রহরী তোফায়ের আহমেদের মাধ্যমে চোরাই পথে বিক্রি করেন। তিনি অফিস থেকে স্কুলে বই পরিবহন বাবদ বিল নিয়েও দুর্নীতি করেন। ৩০০ বই পরিবহন করলে দ্বিগুণ বিল দেখিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেন। টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে একাডেমিক সুপারভাইজার মহিউদ্দীনকে নিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েও লাভ হয় না।
একাডেমিক সুপারভাইজার মহিউদ্দীন ২০১৫ সালে মধুপুরে যোগদান করেন। দীর্ঘদিন একই স্টেশনে চাকরি করায় একটা অবৈধ বলয় গড়ে তুলেছেন। তাদের নিয়ে তিনি বাড়তি পাঠ্যবই আনা এবং চোরাই বই বিক্রির অবৈধ ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিলি করার পর কোনো কারণে পাঠ্যবই থেকে গেলে উপজেলা পাঠ্যবই বিতরণ কমিটির সম্মতিক্রমে নিলামে বিক্রি করা যায়। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মধুপুর মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস পাঠ্যবই নিলামে বিক্রি করা হয়নি। এখন প্রশ্ন উঠছে– দেড় যুগের থেকে যাওয়া প্রায় ৩৫ লাখ পাঠ্যবই গেল কোথায়?
একাডেমিক সুপারভাইজার মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, চাহিদাপত্র পাঠানো এবং বিতরণের পর থেকে যাওয়া বইয়ের হিসাব ও গুদামজাত করার বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলতে পারবেন। তিনি এসবের কিছু জানেন না।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) বাবুল হাসানের ভাষ্য, তিনি সাত মাস ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা পাঠ্য পুস্তক কেলেঙ্কারির বিষয়ে বর্তমান একাডেমিক সুপারভাইজার এবং আগে কর্মরত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।
উপজেলা পাঠ্যবই বিতরণ কমিটির সভাপতি এবং মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক পাঠ্যবই কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটি করতে
যাচ্ছে। তদন্ত শেষে সেই কমিটি বলতে পারবে কেন এসব ঘটেছে।
টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসের এখানে কোনো দায় নেই। সরকারি নিয়মানুযায়ী একটি বইও অবিলি অবস্থায় থাকার কথা নয়। মধুপুরে অবিলি অবস্থায় এতো বই কীভাবে থেকে যায় বা চোরা পথে বিক্রি হয়, তার দায়ভার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এবং পাঠ্যবই বিতরণ কমিটিকে বহন করতে হবে।
- বিষয় :
- বই ছাপা