কোটি টাকার ৩ মার্কেট তালাবদ্ধ বরাদ্দের নামে লুটপাট
চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কোটি কোটি টাকার মার্কেট প্রকল্প। পুরোনো দোকানঘর ভেঙে নতুন মার্কেট নির্মাণ হলেও বরাদ্দের মুখ দেখেননি শত শত ব্যবসায়ী। কোনো মার্কেট আট বছর, কোনোটি সাত বছর, আবার কোনোটি দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দোকানের প্রধান দাবিদার হয়ে ওঠায় উপজেলা প্রশাসন বছরের পর বছর মার্কেটটি বন্ধ করে ফেলে রাখে।
এদিকে ভিটেমাটি ও ব্যবসা হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ঋণের বোঝা টেনে নিঃস্ব হচ্ছেন, কেউবা জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীতে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দোকান বরাদ্দের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাবেক ও বর্তমান বাজার কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে।
উপজেলার তিনটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র নন্দনগাছী, চৌমুহনী ও বাঁকড়া বাজারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে কোটি কোটি টাকায় নির্মিত এসব মার্কেট এখন অলস পড়ে আছে। অব্যবহৃত অবস্থায় ভবনগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নন্দনগাছীতে বরাদ্দের নামে চাঁদাবাজি
চারঘাটের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র পশুর হাটের স্থান নন্দনগাছীতে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা আধুনিক মার্কেট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মার্চে কাজ শেষের কথা থাকলেও তার আগে ২০১৯ সালে ভেঙে ফেলা হয় ৮২ জন ব্যবসায়ীর বসতভিটা সমতুল্য পুরোনো দোকানঘর। এক বছরের মধ্যে নতুন ঘর বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস মিললেও গত সাত বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এই মার্কেটে ঘর দেওয়ার কথা বলে ২০১৯ সালে তৎকালীন বাজার কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জুলহাস ইসলাম লিটন ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান। শুধু অতীতই নয়, বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেক ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম মজনুর বিরুদ্ধেও ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
লবণ ব্যবসায়ী জামিরুল ইসলাম ও ঋণগ্রস্ত সিট-কাপড় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম আক্ষেপ করে জানান, দুই দফায় টাকা দিয়েও এখনও ভাগ্যে জোটেনি দোকান। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন বাজার কমিটির সম্পাদক মফিজুল ইসলাম মজনু। তৎকালীন বাজার কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘দোকান বরাদ্দের নামে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের হেয় করতে এখন এসব মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে।’
আট বছরেও চালু হয়নি চৌমুহনী
নন্দনগাছীর মতো করুণ অবস্থা ইউসুফপুর ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারের। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ মার্কেটটির কাজ ২০১৮ সালে শেষ করে এলজিইডি উপজেলা প্রশাসনের কাছে বুঝিয়ে দিলেও আট বছরেও তা চালু হয়নি। এতে দোকান হারানো ১৫ পুরোনো ব্যবসায়ী গত আট বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দিন কাটাচ্ছেন।
চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলটির নেতারা অনেকের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছিলেন। কিন্তু বরাদ্দ হয়নি। এখনও হচ্ছে না। সরকারি সম্পদ পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, আমরা ব্যবসা করতে না পেরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি।’
চৌমুহনী বাজার কমিটির সভাপতি জাহিদুল করিম বলেন, ‘দোকান বরাদ্দের নামে কেউ টাকা নিয়েছে কিনা জানা নেই। নানা কারণে বারবার উদ্যোগ নিয়েও মার্কেট চালু হয়নি। চেষ্টা চলমান আছে।’
তালাবদ্ধ বাঁকড়া বাজার
একই চিত্র ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বাঁকড়া বাজারেও। ২০২৩ সালে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত মার্কেটটি ২০২৪ সালের মে মাসে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হলেও গত দুই বছর ধরে এটি তালাবদ্ধ রয়েছে। ফলে ঘর হারিয়ে ভীষণ অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন বাচ্চু আলীর মতো স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী বাচ্চু আলী বলেন, ‘আমার দুটি দোকান সেখানে ছিল। আমার মতো আরও অনেকের দোকান ভেঙে মার্কেট করা হয়েছে। এখন আর দোকান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। দোকানের জন্য আবেদন করে রেখেছি। দিনের পর দিন ঘুরেও দোকান পাচ্ছি না।’
বাঁকড়া বাজার কমিটির সভাপতি শামীম রানা সুমন বলেন, ‘আমিও এক বছর ধরে দোকান বরাদ্দ করানোর জন্য ঘুরছি। ব্যবসায়ীরা আমার কাছে আসছেন। উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
রাজনৈতিক চাপে বরাদ্দ বন্ধ
উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দোকানের প্রধান দাবিদার হয়ে ওঠেন। ফলে মাত্র ১০টি দোকানের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১০০টি। এই জটিলতার কারণে উপজেলা প্রশাসন বছরের পর বছর মার্কেটটি বন্ধ করে ফেলে রাখে। এই স্থবিরতার কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবসায়ীদের কপাল পুড়ছে এবং তারা ব্যাপক লোকসানের শিকার হচ্ছেন।
চারঘাট উপজেলা প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, চৌমুহনী ও বাঁকড়া বাজারের মার্কেট যথাসময়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং নন্দনগাছীর মার্কেটও শিগগির হস্তান্তরিত হবে; ঘর বরাদ্দের পুরো দায়িত্ব প্রশাসনের।
চারঘাটের ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, নন্দনগাছী মার্কেটটি বুঝে পাওয়ার পর নিয়ম মেনে স্বচ্ছতার সঙ্গে ঘর বরাদ্দ করা হবে এবং এতে কোনো অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বাঁকড়া ও চৌমুহনী বাজারের তালাবদ্ধ মার্কেটগুলোর বরাদ্দ প্রক্রিয়াও দ্রুত শুরু করার আশ্বাস দেন তিনি।
- বিষয় :
- লুটপাট