কীভাবে বুঝবেন কোলেস্টেরল বেড়েছে
ডা. সাজেদুর রহমান
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
উচ্চ কোলেস্টেরল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মসলা ও ফাস্টফুড এড়িয়ে শাকসবজি, ফলমূল, ওটস ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত। এর পাশাপাশি নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন
কোলেস্টেরল মানবদেহের কোষ তৈরি ও হরমোন উৎপাদনের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি উপাদান। তবে রক্তে এর পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা রক্তনালির দেয়ালে জমে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, শরীরে কোলেস্টেরল বাড়লেও প্রাথমিক অবস্থায় অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে নীরব ঘাতক বলা হয়ে থাকে। তবে সতর্ক দৃষ্টি রাখলে এবং শরীরের কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে কোলেস্টেরল বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব।
হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কে প্রভাব
রক্তনালিতে চর্বি জমার কারণে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, যার প্রথম প্রভাব পড়ে হৃদযন্ত্র ও রক্ত সংবহনতন্ত্রে। বুক ধড়ফড় করা, সামান্য পরিশ্রমে বা হাঁটাচলা করলে বুক চেপে আসা বা ব্যথা অনুভূত হওয়া উচ্চ কোলেস্টেরলের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, ফলে সার্বক্ষণিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে সঠিক মাত্রায় অক্সিজেন ও রক্ত না পৌঁছালে হঠাৎ করে মাথা ঘোরানো, মাথা ঝিমঝিম করা বা ঘন ঘন তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে।
হাত ও পায়ে রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা
শরীরের প্রান্তিক অংশগুলোতে যেমন হাত ও পায়ে কোলেস্টেরল বাড়ার লক্ষণ তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট হয়। রক্তনালিতে চর্বির আস্তরণ জমার ফলে হাত ও পায়ে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এর ফলে হাত বা পা ঘন ঘন অবশ হয়ে যাওয়া, ঝিমঝিম করা কিংবা ঠান্ডা হয়ে থাকার অনুভূতি হতে পারে। অনেকে হাঁটার সময় পায়ে বা মাংসপেশিতে তীব্র টান ও ব্যথা অনুভব করেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ বলা হয়। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চোখ ও ত্বকের পরিবর্তন
উচ্চ কোলেস্টেরলের কিছু স্পষ্ট লক্ষণ চোখে ও ত্বকেও ফুটে ওঠে। চোখের পাতার ওপর বা চোখের চারপাশে নরম, হলুদ রঙের চর্বির ছোট ছোট দলা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জান্থেলাস্মা। এটি রক্তে অতিরিক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরলের একটি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত। অনেক সময় বয়স্কদের ক্ষেত্রে অথবা উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চোখের মণির চারপাশে একটি ধূসর বা সাদা রঙের বলয় বা রিং তৈরি হতে দেখা যায়। এছাড়া কনুই, হাঁটু বা হাতের তালুর ত্বকের নিচে ছোট ছোট চর্বির গুটি বা গুটি দেখা দিতে পারে।
হজমপ্রক্রিয়া ও ঘুমের ব্যাঘাত
হজমপ্রক্রিয়া ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গের কাজের পরিবর্তন থেকেও কোলেস্টেরল বাড়ার আঁচ পাওয়া যায়। যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমলে বা রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হলে হজমে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। সামান্য খাবার খেলেই পেট ভারী লাগা, গ্যাস বা অম্লতার সমস্যা বেড়ে যাওয়া এবং যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে পেটের ডান দিকের উপরিভাগে এক ধরনের অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, রক্তে চর্বির মাত্রা অত্যধিক বাড়লে রাতে ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট হওয়া কিংবা পা কামড়ানোর মতো অস্বস্তি হতে পারে, যা ঘুমের গুণগত মান নষ্ট করে।
উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক ক্লান্তি
উচ্চ কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। রক্তনালির ভেতর চর্বি জমে সরু হয়ে গেলে হৃদযন্ত্রকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিতে রক্ত পাম্প করতে হয়, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মনোযোগে ঘাটতি এবং মানসিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
কোলেস্টেরল নির্ণয়ের উপায়
উচ্চ কোলেস্টেরল নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট উপায় হলো রক্ত পরীক্ষা করা, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় লিপিড প্রোফাইল টেস্ট বলা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে মোট কোলেস্টেরল, ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল, খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সঠিক মাত্রা জানা যায়। কুড়ি বছর বয়সের পর থেকে প্রত্যেক মানুষেরই অন্তত প্রতি কয়েক বছরে একবার এই পরীক্ষা করানো উচিত। পরিবারে হৃদরোগ বা চর্বির সমস্যা থাকলে আরও অল্প বয়স থেকে নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার
উচ্চ কোলেস্টেরল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মসলা ও ফাস্টফুড এড়িয়ে শাকসবজি, ফলমূল, ওটস ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত। এর পাশাপাশি নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থ ও দীর্ঘজীবন বজায় রাখা সম্ভব।
[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
- বিষয় :
- কোলেস্টেরল