ইউরোপের চিঠি
সভ্যতার মাপকাঠি ও পোশাকের অধিকার
দাউদ হায়দার
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২২ | ০০:৪৩
শতাধিক বছর আগে 'হ য ব র ল' গল্পে সুকুমার রায় কী বলেছিলেন, পাঠক পড়ে নেবেন। এখন মনে পড়ছে, ১৯৮৭ সালে, সেপ্টেম্বরে জার্মানির সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলার যে রায় দিয়েছিলেন, জনগণ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শেষাবধি রায় বাতিল। আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ। ফৌজদারি, হাইকোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা, চালান সব দেশেই আছে।
১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকে (ইমার্জেন্সি) থোড়াই কেয়ার করে ভারতীয় রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজনারায়ণ এক মামলায় কার্যত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকেই চ্যালেঞ্জ জানান। আদালত অবমাননার রায়ও মানেন না। পরে তিনি জিতে যান, সর্বার্থে। এও এক ইতিহাস। জনতার শক্তিই সবকিছুর মূলে। যেমন আমরা ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনে 'জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো।' এনেছি। তিনি দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার স্থপতি।
যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বের নানা দেশের নজর। ভৌগোলিক কারণ তো আছেই। সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য। তেল, গ্যাসের খবর চাউর করে বঙ্গোপসাগরের একটি বিশেষ অঞ্চল কীভাবে কবজা করবে, পাঁয়তারা কষছে। প্রলোভন দেখাচ্ছে। ছলেবলে না হলে প্রচ্ছন্ন হুমকিও।
অন্যদিকে, গোটা দেশকে শরিয়তি আইনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার জোর কদমে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটি মহল। আলামত ইতোমধ্যে স্পষ্ট। দেশের ভেতরেই সংঘবদ্ধ। সুযোগ-সুবিধে পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ নামও থাকবে না। জাতীয় সংগীত উধাও। 'বাংলাস্তান' নিয়ে কোনো গীত। কিংবা 'বাংলাস্তান'-এর বদলে 'ইসলামস্তান'। যে রকম পাকিস্তান করেছে একটি অঞ্চলের বদলে ইসলামাবাদ।
বাংলাদেশে শরিয়তি আইন নেই ঠিকই, কিন্তু কমই-বা কী? রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। প্রকাশ্যে না-বললেও মূলত তৃতীয় শ্রেণির। সংখ্যালঘুরা কিছু বলতে পারবে না। ভয়ে। মাথা নত। বললে এ-অপবাদ, ও-অপবাদে নির্যাতন। সরকার মৌনী। কঠোর নয়। কঠোরতার হিম্মত নেই। ধর্মব্যবসায়ীদের তোয়াজ করতে হবে। তোষামোদ করতে হবে। যেমন দেখেছি। স্কুলের পাঠ্যসূচি বদল। হেফাজতে ইসলামের নানা দাবি মেনে নিয়েছে। টুঁ শব্দ করেনি।
এইসব নিয়ে কেন সোচ্চার হইনি? আন্দোলন করিনি? হেতু কি এই নয়- দেশের মানুষ কোনো অদৃশ্য দাপটে চুপ? না, চুপ আর থাকব না। থাকলে দোষী। আওয়ামী লীগকে কারা ভোট দেয়, কারা কখনোই দেয় না- প্রমাণিত। সরেজমিন তত্ত্বতালাশ করেছে একটি এনজিও। নাম বলছি না। অনুচিত। বললে বিপদ হয়তো। এনজিওর সহপরিচালক বার্লিনে এসেছিলেন। দেখা করেন। জানান, 'ধর্মীয় উগ্র পন্থা বাড়ছে। সরকারের কাছে রিপোর্টও পেশ করেছি।'
যেহেতু ফেস নেই, বুকও নেই; তাই ফেসবুক ব্যবহার করি না। বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে মাঝেমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল দেখি। ধর্মের নামে অধর্মের কত কারবার দেখি। মসজিদের ইমাম মানুষ খুন করে আবার নামাজ পড়াতে দাঁড়িয়েছেন। মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ করে মাদ্রাসারই শিক্ষক। মিডিয়ারই খবর। ইসলামের নামে ইসলাম রক্ষার্থে কী হচ্ছে তবে? প্রশ্ন তুললেই নাসারা, মুরতাদ? নাসারার তৈরি মোবাইল ব্যবহার করে হুজুর, মোল্লারা। তার বেলায়?
জঘন্য উৎপাত ডিজিটাল আইন। গজব। শত্রুরা এর-ওর বিরুদ্ধে বানোয়াট মিথ্যাচার ছড়িয়ে কী কাণ্ডই না করছে! রেহাই নেই হিন্দু সম্প্রদায়ের। সাংবাদিকের। জেল। সত্যতা বিচার পরে। আগে ধরো, মারো। প্রশ্ন জাগে- দেশের লোক কী করছে? চোখে পরেছে ঠুলি? কানে দিয়েছে তুলো? রা নেই মুখে? তিন বানর একত্রিত নাকি?
এতদিন জানা- চোর চুরি করলে, ধরা পড়লে বিচার, শাস্তি, জেল। হেফাজতে ইসলামের মামুনুল হক পরের বউ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টে ধরা পড়ে (সেই বউ বলেছে, 'মিথ্যে কথা বলে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে')। বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র সংগঠন মোল্লা-মুসল্লি জুটিয়ে মামুনুল হকের মুক্তি আন্দোলন। তার অভাবে বাংলাদেশে ইসলাম নাকি রসাতলে যাচ্ছে! কী বিচিত্র এই দেশ, সেলুকাস!
এ বছর মে মাসে নরসিংদীর রেলস্টেশনে এক তরুণী, সকালে, টি-শার্ট-প্যান্ট পরে। তাঁকে দেখে জনৈকা 'সভ্য' নারী ঝামেলাকারী উত্তেজনায় ভুগতে থাকে। কিছু মানুষ নিয়ে ওই নারী ও তার দুই বন্ধুকেও গালিগালাজ ও মারধর। ভিডিও ভাইরাল। পোশাকের জন্য তরুণীকে হেনস্তায় ক্ষোভ প্রকাশও হতে থাকে ফেসবুকে। সমালোচনার তোড়ে ঝামেলাকারী নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই নারীর জামিন শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারক বলেন- 'সভ্য দেশে এমন পোশাক পরে রেলস্টেশনে যাওয়া যায় কি-না?' (সমকাল অনলাইন, ২৭ আগস্ট, ২০২২)।
সভ্য দেশ কাকে বলে? সংজ্ঞা কী? পোশাকের অধিকার কী? ইউরোপ 'অসভ্য' দেশ? গ্রীষ্ফ্মে চলে আসুন। দেখবেন। ইউরোপে, নর্থ বা সাউথ আমেরিকায়, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশে আপত্তি? ঠিক আছে। মিসর, মরক্কো, আলজেরিয়া, তুরস্ক, তিউনিসিয়ায় ঘুরুন। 'আপত্তিকর পোশাক' দেখলে অসভ্য দেশ? পোশাকের অধিকার 'সভ্য দেশ' ঠিক
করবে? সভ্য-বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে কি? থাকলে দেখান।
এক সময় বক্ষবন্ধনী ছিল না। এখন প্রয়োজনে ব্যবহৃত। এও কি সভ্য দেশের অসভ্যতা? প্যান্ট পরাও? পোশাকের 'অধিকার' নিয়েও বিচারক প্রশ্ন রাখবেন?
তরুণী কী পরেছেন? টি-শার্ট। প্যান্ট। শর্টস পরনে? না। টি-শার্ট, প্যান্ট দেখেই 'আপত্তিকর?' ঢাকায় তরুণীদের এই পোশাকে দেখা যায় না? সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার দৌলতে দেখেছি। দেখিয়েছেন এক বন্ধু। তাঁর বাঙালি হিজাবি বউও দেখেছেন। আপত্তি করেননি।
জার্মানি 'সভ্য' দেশ নয়। ২১ আগস্ট (২০২২) জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলজ এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসতেই বহু লোকের বিক্ষোভ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে। কয়েকজন তরুণী নগ্নবক্ষা। প্রতিবাদী। শলজ তাঁদের সঙ্গে সহাস্য ছবিও তোলেন। পুলিশ কিছু বলেনি। তরুণীদের গ্রেপ্তারও করেনি। ছবি মিডিয়ায় প্রকাশিত। প্রদর্শিত। সভ্যতা, পোশাকের মাপকাঠি, সংজ্ঞা কী? অসভ্যতা?
দাউদ হায়দার: কবি
- বিষয় :
- ইউরোপের চিঠি
- দাউদ হায়দার