ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
×

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার 'দুর্মর' কবিতায় বাংলাদেশেকে তুলে ধরেছেন এভাবে- 'সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয়ঃ/জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।' কবি তার এ কথার দ্বারা এক সাহসী, প্রতিবাদী, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার বাংলাদেশকেই বোঝাতে চেয়েছেন। বস্তুত সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। এই ভূখণ্ডের মানুষদের সংগ্রামমুখর জীবন, মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রত্যয়ে জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় পদক্ষেপ বিশ্বকে সময়ে সময়ে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছে। এ উর্বর মাটিতে যেমন সোনা ফলে, তেমনি এখানে জন্ম নিয়েছেন বহু বিশ্ববরেণ্য মানবসন্তান।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, 'জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও।' তার চারশ' বছর পরে বাংলাদেশের এক সন্তান শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর সুদূর তিব্বতে গিয়েছিলেন শিক্ষাগুরু হিসেবে জ্ঞান বিতরণের উদ্দেশ্যে। আমাদের কীর্তিমান পূর্বপুরুষ স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুও বিশ্বকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিলেন উদ্ভিদের জীবনতত্ত্ব এবং বেতারযন্ত্র আবিস্কার করে। আমাদের বুয়েট থেকে পাস করা স্থপতি ফজলুর রহমান খানের নকশা ও তত্ত্বাবধানে আমেরিকার শিকাগো শহরে ১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ অফিস ভবন 'উইলিস টাওয়ার' যা 'সিয়ার্স টাওয়ার' নামে সুপরিচিত। ১১০ তলা বিশিষ্ট ১৪৫০ ফুট উচ্চতার ওই ভবনের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে সে সময় বিশ্ববাসীর নিশ্চয়ই বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে থাকবে। স্থপতি ফজলুর রহমান খানের সে কীর্তি আজও বাংলাদেশের গৌরবের পতাকা উড্ডীন করে রেখেছে। সাঁতারু ব্রজেন দাশ ১৯৫৮ সালে ২৯ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে যখন ইংলিশ চ্যানেল পার হলেন, বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। আর ভেবেছে কী আছে ওই ছোট্ট দেশটির মাটিতে!
বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছে- এ দেশ, এ জাতি কখনও মাথা নত করেনি কোনো অপশক্তির কাছে। মেনে নেয়নি কোনো লুটেরা, বেনিয়া শাসক-শোষক গোষ্ঠীর অবিচার, অত্যাচার, জুলুম। বর্গিরা এখানে হানা দিয়েছে সম্পদ লুণ্ঠনের আশায়, পর্তুগিজ জলদস্যুরাও এসেছে লুটে নিতে বাংলাদেশের সম্পদ। বাণিজ্য করতে এসে ইংরেজরা বনে গিয়েছিল শাসক। বাংলাদেশের মানুষ সে শাসন-শোষণকে নীরবে মেনে নেয়নি। জ্বলে উঠেছে ক্ষণে ক্ষণে। আর তাই দেখা যায় ক্ষুদিরামকে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে যেতে, মাস্টারদা সূর্য সেনকে অকাতরে জীবন দিতে, আর বাঁশের কেল্লা বানিয়ে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা যায় নিসার আলি তিতুমীরকে। ইংরেজ বিদায় নিল। নতুন এক শোষক গোষ্ঠী সওয়ার হলো বাংলার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াল। ১৯৫২ সালে পৃথিবী নতুন রূপে দেখল বাংলাদেশকে। কোনো জাতি নিজেদের মাতৃভাষার জন্য রাজপথে রক্ত ঢেলে দিতে পারে- এ যে ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে! গোটা বিশ্ব বাঙালির সে আত্মদানের ঘটনায় হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। আর ১৯৭১ সালে তারা কী দুরন্ত সাহসে রুখে দাঁড়াল পাকিস্তানি সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে!
বাংলাদেশ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। আমরা গর্বিত কারণ পৃথিবী অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাদের দেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে গোটা পৃথিবীর। আজ যখন আমরা শুনি পাটের জিনোম অবিস্কার করেছেন এই বাংলাদেশের গবেষকরা, যখন শুনি বাংলাদেশের কোনো এক বিজ্ঞানী বিদেশে বসে তার নতুন আবিস্কার দ্বারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছেন, আমরা গর্ববোধ করি। গলা ছেড়ে বলতে ইচ্ছা করে- দেখো, আমরা কোনো অংশে কম নই কারও চাইতে। আমরাও পারি। তোমরা আমাদের দেখো, অবাক হয়ে দেখো। তাকিয়ে থাকো এই অদম্য বাংলাদেশের দিকে।
আজ নানা কারণে আমাদের সেই অহংকারের জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, আজও পৃথিবী অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে বাংলাদেশকে। তবে সে তাকানো মুগ্ধতার নয়, ভ্রুকুঞ্চিত করে বিস্ময় প্রকাশের। পৃথিবী আজ ভাবছে, এই কি সেই বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে, সংগ্রাম করে গণতন্ত্র উদ্ধার করেছে? অস্বীকার করা যাবে না- এটাই সেই চিরচেনা বাংলাদেশ। কিন্তু আজ তার রূপান্তর ঘটেছে।
বর্তমানে সারাবিশ্ব করোনাভাইরাস আক্রমণে বিপর্যস্ত। প্রতিটি দেশ আজ এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যে, কেউ কারও দিকে তাকানোরও ফুরসত পাচ্ছে না। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, নিচ্ছে। সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। আর জনসাধারণ সরকারের নির্দেশ মতো লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে সহযোগিতা করছে। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম বোধকরি বাংলাদেশ। এখানে কাজের চেয়ে কথা বেশি হচ্ছে। চারদিকে একটি হযবরল অবস্থা।
এরই মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একটি খবর সবাইকে হতবাক করে দিল- করোনা টেস্ট নিয়ে অমানবিক দুর্নীতি। ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয়ে আলোচনায় উঠে আসা প্রতারক মো. সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনার জেকেজি থেকে হাজার হাজার মানুষকে কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দেওয়া হয়েছে করোনার সার্টিফিকেট। এদের কাউকে দেওয়া হয়েছে পজিটিভ আর কাউকে নেগেটিভ সনদ। এ করোনা বাণিজ্যে ওরা হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। অর্থলোভে কোনো মানুষ এমন কাজ করতে পারে তা অবিশ্বাস্য। সাহেদ-সাবরিনাসহ অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়েছে। হয়তো ওদের শাস্তিও হবে। তবে, যে কলঙ্কের দাগ ওরা বাংলাদেশের গায়ে লাগিয়ে দিল তা কি কখনও মুছে ফেলা সম্ভব হবে?
ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন পত্রিকায় যখন মোটা হরফের ব্যানার হেডিংয়ে খবর বেরোয় 'বাংলাদেশে করোনার ভুয়া সনদ বিক্রি হয়'- লজ্জায় আমাদের মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে ঘটতে পারে তা যে কল্পনাতীত! করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে ইতালি গমনকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের দেহে যখন করোনা ধরা পড়ে এবং বিমানবন্দর থেকে তাদের ফেরত পাঠানো হয়, তখন তখন ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের উন্নত শির কি নিচু হয়ে যায় না?
মানুষের জীবন নিয়ে এই যে ছিনিমিনি খেলা, তা কি অন্য দশটি অপরাধের সঙ্গে তুলনীয়? যারা মানুষের জীবন-মরণ সমস্যাকে পুঁজি করে অবৈধভাবে অর্থ কামাইয়ের ধান্ধায় লিপ্ত হয়, তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার শামিল। এদের বিচার হওয়া উচিত মানবতাবিরোধী অপরাধ আইনে। বিশ্বের অনেক দেশে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক সময় খুনের আসামিকেও মাফ করে দেওয়া হয়। কিন্তু খাদ্য, ওষুধ এবং চিকিৎসা নিয়ে কোনো দুর্নীতিকে ক্ষমা করা হয় না।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ব করেছিলেন। বলেছিলেন, পৃথিবী অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে বাংলাদেশকে। আজও হয়তো পৃথিবী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। তবে সে তাকানো সপ্রশংস নয়, বক্র। বিস্মিত তারা দেখছে এখানে মানুষের জীবনের প্রশ্নেও দুর্নীতি হয়। নকল ওষুধ, নকল টেস্ট, নকল হাসপাতাল, নকল ডাক্তার। এ লজ্জা কী দিয়ে নিবারণ হবে কে জানে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×