‘এখন শান্তিতে মরতে দাও’, মৃত্যুর আগে টুইশার শেষ বার্তা
টুইশা শর্মা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:১০ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৩৭
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে টুইশা শর্মার মৃত্যুর আগে শেষ ৯০ মিনিটের ঘটনাপ্রবাহের একটি মিনিটভিত্তিক বিবরণ সামনে এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) ১৪ আগস্ট আদালতে যে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে, তাতে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোনকল, সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসকদের বক্তব্য ও পরিবারের সদস্যদের তথ্যের ভিত্তিতে ওই সময়ের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, টুইশাকে তার স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতন করছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে টুইশাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
টুইশা ও সমর্থের বিয়ে হয়েছিল ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর। বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় ২০২৬ সালের ১২ মে টুইশার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর আগে শেষ দেড় ঘণ্টা
সিবিআইয়ের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ১২ মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে টুইশা তার ননদ রাশি আব্রোলকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
এর চার মিনিট পর, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে টুইশাকে একা নিচতলা থেকে ছাদে যেতে দেখা যায়।
এর এক মিনিট পর, রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি বাবাকে ফোন করেন। সিবিআই বলছে, ফোনে টুইশা কাঁদছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী সমর্থ ‘খুব আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ আচরণ করছেন। তিনি ভয় পাচ্ছেন এবং তার বাবা-মাকে দ্রুত তার কাছে আসতে বলেন।
রাত ১০টা ৫ মিনিটের দিকে মাকেও ফোন করেন টুইশা। মায়ের কাছেও তিনি স্বামীর আগ্রাসী আচরণের কথা বলেন। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এরপর টুইশার মা বারবার মেয়েকে ফোন করেন। সমর্থ ও গিরিবালাকেও ফোন করার চেষ্টা করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে টুইশার মা গিরিবালাকে ফোন করে জানান, টুইশা খুব কাঁদছিলেন। তাকে মেয়ের খোঁজ নিতে বলেন।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১০টা ১৬ মিনিটে গিরিবালা তার কক্ষ থেকে বের হয়ে নিচতলায় টুইশার ঘরে যান। সেখানে তাকে না পেয়ে রাত ১০টা ১৮ মিনিটে টুইশাকে ফোন করেন। দুই মিনিট পর সমর্থকে ফোন করেন তিনি।
রাত ১০টা ২৩ মিনিটে গিরিবালার পর সমর্থকেও ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়।
পরে সমর্থ, তার এক চাচাতো ভাই ও বাড়ির এক কর্মী টুইশাকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে আসেন। তাকে ভোপালের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে (এআইআইএমএস) নেওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
বিয়ের কয়েক মাসেই সম্পর্কে অবনতি
সিবিআইয়ের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, টুইশা ও সমর্থের পরিচয় হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনলাইন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে। ওই বছরের ডিসেম্বরেই তাদের বিয়ে হয়।
সিবিআইয়ের দাবি, বিয়ের পর থেকেই সমর্থ টুইশার সঙ্গে মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক আচরণ করতেন। তার আগের সম্পর্ক নিয়ে স্বামী তাকে অপমানজনক কথা বলতেন। সমর্থের মা গিরিবালাও বিভিন্ন সময় ছেলের পক্ষ নিতেন বা তাকে উসকানি দিতেন বলে সিবিআইয়ের অভিযোগ।
মার্চ ও এপ্রিল মাসে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে টুইশা অন্তঃসত্ত্বা হন। ১৬ এপ্রিল তিনি জানতে পারেন, তিনি গর্ভবতী। সন্তানটি অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়া এবং স্বামীর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তিনি গর্ভধারণ চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন বলে সিবিআই জানিয়েছে।
গর্ভপাত নিয়েও বিরোধ
৬ মে টুইশা তার আগের কর্মস্থলে আবার যোগ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিন তিনি গর্ভপাতের ওষুধের প্রথম ডোজ নেন। পরদিন ভোরে মাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তাকে ভোপাল থেকে নিয়ে যেতে বলেন। সিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, টুইশা লিখেছিলেন, তিনি মনে করছেন সমর্থ আর তাকে চান না।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, টুইশার গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার শাশুড়ি আপত্তি করেছিলেন। গর্ভপাতের প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না, তা জানতে তাকে চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক জানান, প্রক্রিয়াটি ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
সিবিআই বলছে, এ সময় টুইশা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না।
৮ মে তিনি গর্ভপাতের দ্বিতীয় ডোজ নেন। ওই সময় প্রচণ্ড ব্যথা ও রক্তপাত হচ্ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। টুইশার অভিযোগ, তার স্বামী বিষয়টিকে ‘নাটক’ হিসেবে দেখেছিলেন এবং শাশুড়িও তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করেননি।
অর্থ নিয়েও চাপ দেওয়ার অভিযোগ
দাম্পত্য কলহের পাশাপাশি অর্থ নিয়ে চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেছে সিবিআই।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, টুইশার একটি ডিম্যাট হিসাবে প্রায় ২০ লাখ রুপি মূল্যের শেয়ার ছিল। সমর্থ ও গিরিবালা ওই বিনিয়োগ যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য তাকে চাপ দিয়েছিলেন বলে সিবিআইয়ের দাবি।
টুইশা এতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছিলেন, ওই অর্থ তার বাবার।
মৃত্যুর দিন সন্ধ্যা ৭টা ৫১ মিনিটের দিকে টুইশা তার ননদ রাশি আব্রোলকে ফোন করে জানান, তিনি ভোপাল ছেড়ে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সমর্থ তাকে বিনিয়োগের অর্থ স্থানান্তর করে চীনের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সিবিআই জানিয়েছে, যৌতুকের অভিযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
মৃত্যুর দিনও বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি
১২ মে সকালে টুইশা মায়ের কাছে ৩ হাজার রুপি চান ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য। বাবার কাছ থেকে ওই অর্থ পাওয়ার পর তিনি রাজস্থানের নাসিরাবাদের উদ্দেশে ট্রেনের টিকিট কাটেন।
সিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, টুইশা পরিবারকে জানিয়েছিলেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সমর্থ দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি না হওয়ায় তিনি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পরে সমর্থ কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি হন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কাউন্সেলিং করেন। চিকিৎসকের কাছে সমর্থও টুইশার আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেন এবং জানান, তারা দুজন গাঁজা সেবন করতেন। চিকিৎসক তাকে স্ত্রীর কথা মন দিয়ে শুনতে এবং সময় দিতে পরামর্শ দেন।
দুপুরে তারা বাড়ি ফেরেন। বিকেলে টুইশা একটি বিউটি পার্লারে যান। সন্ধ্যা ৬টা ১১ মিনিটে বাড়ি ফেরেন।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, বাড়ি ফেরার পর তিনি সমর্থ ও গিরিবালাকে বাইরে হাঁটতে দেখেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তাকে উপেক্ষা করেন বলে টুইশা মাকে জানান। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ‘চিরতরে’ ভোপাল ছেড়ে চলে যাবেন।
আত্মহত্যা বলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন
টুইশার মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। পরে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের নির্দেশে দিল্লির এআইআইএমএসের একটি মেডিকেল বোর্ড দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করে।
সিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে উদ্ধৃত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গলায় ফাঁস দেওয়ার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে টুইশার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ধরন আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার শরীরে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা মৃত্যুর আগে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ, সিবিআইয়ের মামলাটি টুইশাকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে নয়। সংস্থাটির দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের কারণে তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
তদন্ত এখনো শেষ হয়নি
সিবিআই সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫, ১০৮ ও ৩(৫) ধারায় অভিযোগ এনেছে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। টুইশার আইফোন থেকে ফরেনসিক তথ্য সংগ্রহের কাজ বাকি রয়েছে। বাড়ির সিসিটিভির ডিভিআরও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এতে কোনো তথ্য পরিবর্তন বা কারসাজি করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া সমর্থ ও গিরিবালার কণ্ঠস্বরের নমুনাও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
যৌতুক দাবি ও যৌতুকজনিত মৃত্যুর অভিযোগও আরও তদন্ত করার অনুমতি চেয়েছে সিবিআই। ফলে টুইশা শর্মার মৃত্যুর মামলায় তদন্ত এখনো চলমান।
সূত্র: এনডিটিভি