ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিক্রি কমে সাড়ে ১৪ লাখ টন পাথরের স্তূপ

বিক্রি কমে সাড়ে ১৪ লাখ টন পাথরের স্তূপ
×

দিনাজপুরের পাবর্তীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে পাথরের বিশাল স্তূপ। ছবিটি সম্প্রতি তোলা সমকাল

স্বপন চৌধুরী, রংপুর

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিক্রি কমেছে দিনাজপুরের পাবর্তীপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে। রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ (পাউবো) সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষিত। ফলে উত্তোলিত পাথরের মজুত বাড়ছে দেশের একমাত্র এই খনিতে। যে কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে খনি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতোমধ্যে পাথরের মজুত খনির তিনতলা ভবনের প্রায় সমান হয়ে গেছে। খনির ২৫টি ইয়ার্ডে পড়ে আছে প্রায় ১৫ লাখ টন পাথর। বিক্রি না হওয়া, মজুতের জায়গা সংকটে পাথর উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, মধ্যপাড়া খনির পাথরের মান অনেক ভালো। কিন্তু পাথর আমদানিতে ঝোঁক বেশি থাকায় সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে।
মধ্যপাড়া খনি থেকে পাথর উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বেলারুশ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। ১৯৯৪ সালে খনিটি উদ্বোধন করা হয়। ২০০৭ সালে সেটি এমজিএমসিএলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিন শিফটে দিনে সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব পাথর বিক্রির দায়িত্ব পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের। তারা ১৬৫ জন ডিলারের মাধ্যমে পাথর বিক্রি করে। কিন্তু এসব ডিলারের সবাই পাথর নিচ্ছেন না। 
তথ্যমতে, দেশে পাথরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে প্রতিবছর ১ কোটি ঘনফুট পাথরের চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া নদী শাসনসহ অন্যান্য সরকারি উন্নয়নকাজেও লাগে। এসব পাথরের সিংহভাগ ভারত, ভুটান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। এ কারণে মধ্যপাড়ায় উত্তোলিত পাথরের বিশাল বিশাল স্তূপ জমে গেছে।

খনির ডিলার মেসার্স মমিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মমিনুল হক বলেন, আমদানি করা পাথরের চেয়ে মধ্যপাড়ার পাথর কয়েক গুণ ভালো। ২০০ টাকা কমে মধ্যপাড়া খনির পাথর এখন ডিলারের চাহিদা ও মাপ অনুযায়ী পাওয়া যায়। অনেকেই অজ্ঞাত কারণে ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের ওপর নির্ভরশীল।
খনিসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পাথরের বিভিন্ন মাপ অনুযায়ী এই খনিতে রেলের ব্যালাস্ট ৩৪ শতাংশ, বোল্ডার ১৭ শতাংশ, ৫-২০ সাইজ ১৬ শতাংশ, ২০-৪০ সাইজ ৫ শতাংশ, ৬০-৮০ সাইজ ১১ শতাংশ ও ডাস্ট ১৭ শতাংশ উৎপাদন হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে ভারতের পাথর আমদানির ফলে খনিতে শুধু ৯ লাখ টন ব্যালাস্ট জমে আছে। পাউবো এই খনির বোল্ডার না নিয়ে ব্লক ব্যবহার করছে। এ কারণে সাড়ে ৩ লাখ টন বোল্ডার জমে আছে খনি এলাকায়। যদিও চুক্তির ফলে রেলওয়ে সীমিত পর্যায়ে পাথর নিচ্ছে। একনেকে পাস হওয়া পদ্মা নদী সংরক্ষণ কাজেও বোল্ডার ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু পাউবো এখন ব্লক ব্যবহারের চিন্তা করছে। একনেকে বিল পাস হওয়ার পরও মাগুরা প্রজেক্ট ও ঢাকা-জয়দেবপুর-টঙ্গী ডুয়েলগেজ প্রজেক্টে এ খনির পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে না। এসব কারণে খনি পরিচালনাকারী কোম্পানি বড় বিপদে পড়তে পারে। 
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খনিতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী, পরিবহন শ্রমিক, যন্ত্রাংশ সরবরাহসহ নানা কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। উত্তোলন বন্ধ হলে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। 

এ ছাড়া চুক্তি হলেও ৮০/১২০ বোল্ডার ও ৪০/৬০ মাপের পাথর বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পাউবো নিচ্ছে না। ফলে উত্তোলিত পাথর রাখার জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। এসব কারণ জানিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা চলতি মার্চ মাসের মধ্যেই খনি উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা করছেন। 
খনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, পাথর বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে লাভজনক কোম্পানিটি লোকসানের মুখে পড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে এমজিএমসিএল ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা লাভ করে। ২০১৯-২০ সালে ২২ কোটি ৪০ লাখ, ২০২০-২১ সালে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ, ২০২১-২২ সালে ১৮ কোটি ২৫ লাখ, ২০২২-২৩ সালে ১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা লাভ করে কোম্পানি। কিন্তু পরবর্তী অর্থবছরেই শুরু হয় লোকসানের পালা। ২০২৩-২৪ সালে ৩০ কোটি টাকা ও ২০২৪-২৫ সালে ৭ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয় কোম্পানিকে।
এর কারণ হিসেবে খনি কর্মকর্তারা জানান, ১৫ লাখ টন পাথর অবিক্রীত। পাশাপাশি রয়্যালটি বৃদ্ধি পাওয়ায় ৬ ডলারের ওপরে ২৫ শতাংশ হিসাবে সরকারকে অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। অতীতে বিস্ফোরক অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানিতে শুল্ক ছিল না। এখন ৩৭ শতাংশ গুনতে হচ্ছে। অন্যান্য বিস্ফোরক আমদানিতেও ধার্য শুল্কের পরিমাণ ১০৪ শতাংশ। গত বছর কোম্পানি ২৭৮ কোটি টাকার পাথর বিক্রি করে। যার ৯০ কোটি টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ সরকারকে দিতে হয়েছে।

এ বিষয়ে এমজিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম  বলেন, খনির ইয়ার্ডে মজুত পাথর আছে ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। বর্তমানে ৬ মাপের পাথর উৎপাদন হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের মেগা প্রকল্পসহ অনেক নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় পাথর বিক্রি কমেছে। মধ্যপাড়ার পাথর কেনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। পাউবোর সিডিউলে মধ্যপাড়া খনির পাথর কেনায় নির্দেশাবলি ও মূল্য সংযুক্তি রয়েছে। বাকিতে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল কিছু নিয়েছে। পাউবোও কিনতে আগ্রহ জানিয়েছে। 
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও নদী শাসন কাজে পাউবো পাথর না কেনায় ইয়ার্ড পূর্ণ। বিদেশ থেকে নিয়ে আসা ডেটোনেটরের (বিস্ফোরক) ওপর রয়্যালটি না কমানোয় পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রেলওয়ে, নদীরক্ষা কাজসহ উন্নয়ন কাজে মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এতে দেশের একমাত্র খনিটি প্রাণ ফিরে পাবে।

আরও পড়ুন

×