মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কায় ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। ছবিটি গত ৭ আগস্টের- এএফপি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:০১
গত বছরের সেপ্টেম্বরেও পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল আসিম মুনিরের কাছে বিশ্ব পরিস্থিতি ছিল আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌদি আরবের রিয়াদে সে সময় উপস্থিত থেকে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হন তিনি।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ বলছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ওই চুক্তির আয়োজন করেছিলেন মুনির। তার কাছে সেটি ছিল বড় কৌশলগত সাফল্য। অর্থ সংকটে থাকা পাকিস্তানকে সৌদি আরব বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও ঋণ দেবে। বিনিময়ে পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে দেশটিকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এগিয়ে আসবে। তখন এমন হামলার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তখন পাকিস্তান ধরে নিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক শিগগিরই আবার স্বাভাবিক হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম। তবে এরপর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
এখন পাকিস্তান, বিশেষ করে আসিম মুনিরের ওপর চাপ ক্রমে বাড়ছে। আগস্টে সৌদি আরবের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত করা হয় এবং এর নতুন নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। তিন দেশ সম্মত হয়, তাদের যে কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সিনিয়র ফেলো আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমার মনে হয় না আসিম মুনির এই অঞ্চলের সামনে থাকা হুমকিগুলো যথাযথভাবে হিসাব করেছিলেন এবং এত দ্রুত যে পাকিস্তানকে নিজেদের সেনাদের যুদ্ধে নামাতে হতে পারে, সেটিও তিনি ভাবেননি।’
সৌদি আরবের কাছে কয়েক হাজার কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বাস্তব যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা তাদের নেই। অন্যদিকে হুতিরা কঠিন ও দৃঢ় প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। ভারতের স্থায়ী হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি বাহিনী তাই যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব যদি হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে মক্কা চুক্তি সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পাকিস্তানের সামনে সেনা পাঠানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প থাকবে না। এর মধ্যে সৌদি আরবে প্রশিক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে মোতায়েন থাকা হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনাও রয়েছে। প্রতিরক্ষা অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে প্রায় পুরোপুরি সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি সৌদি আরব পাকিস্তানকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ও বিনিয়োগ দিয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সরকারি মন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তারা চুক্তির প্রতি পাকিস্তানের ‘শর্তহীন’ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সৌদি আরবকে রক্ষায় ইসলামাবাদ ‘যে কোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলে জানান। তবে ব্যক্তিগত আলোচনায় পাকিস্তানের কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে দেশটি জড়িয়ে পড়া নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পাকিস্তান এরই মধ্যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে কার্যত সংঘাতের মধ্যে রয়েছে এবং জঙ্গি তৎপরতার বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত মক্কা চুক্তি সক্রিয় করার মতো ঠিক কোন পরিস্থিতিকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সম্ভবত ধরে নিচ্ছে যে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই বাড়ানোর মাধ্যমে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। তুরস্কও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা এই সংঘাতে জড়াতে চায় না
- বিষয় :
- পাকিস্তান
- সৌদি আরব
- মধ্যপ্রাচ্য