ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪১

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা ও ভৌগোলিক পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট হিসেবে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর সংঘাত। 

গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানসমর্থিত হুতিরা। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর রয়টার্সের। 

হুতিদের হামলার পর রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী আরামকোর জ্বালানি ডিপো থেকে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও আগুনের শিখা উঠতে দেখা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

শনিবার ভোরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। আগের রাতে রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় আল-খার্জ এলাকার অধিবাসীদের মোবাইলে আকাশপথে হামলার ঝুঁকি জানিয়ে জরুরি বার্তা পাঠায় স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। 

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সামরিক-বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একযোগে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছোড়ে হুতিরা। হামলার পর বিমানবন্দরটিতে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। 

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক মাধ্যমে জানান, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া অন্যান্য হামলাও প্রতিহত করা হয়েছে। 

অন্যদিকে, হুতির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া আল-সারিয়া এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানান, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি জোটের সম্প্রতি চালানো প্রায় ৩০০টি বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতেই তারা রিয়াদ ও ইয়ানবুতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর তেল স্থাপনায় এই যৌথ অভিযান চালায়। 

মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের 

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডের নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে জরুরি ভিত্তিতে হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ৯টি দেশের মার্কিন দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। এতে বলা হয়, ইরান ও হুতিদের কেন্দ্র করে চলা সংঘাত আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা ফ্লাইট বাতিল ও আকাশপথ বন্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে। 

ইয়েমেন ফ্রন্টে রক্তক্ষয়ী সংঘাত 

সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও হুতি ও সৌদিসমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘাত চলছে। দেশটির তেলসমৃদ্ধ মারিব, তাইজ, লাহজ, আল-জাউফ ও আল-বায়দা প্রদেশে দুপক্ষের মধ্যে মুখোমুখি লড়াই চলছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংঘাতে অন্তত ৪৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জন হুতি এবং ১৭ জন সরকারি সেনাসদস্য। 
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, জুলাইয়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে এ পর্যন্ত এক লাখ চার হাজার ৭৯৬ জনেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। 

সংঘাতের গতিপথ 

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের গতিপথ এখন অতিমাত্রায় জটিল আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আলজাজিরাকে জানান, রিয়াদ ও আরামকোর স্থাপনায় এই হামলা মূলত হুতিদের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। তারা এটি স্পষ্ট করতে চায়, সৌদির পুরো তেলশিল্প অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। 

তবে এলমাসরি মনে করেন, সৌদি তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের কাছ থেকে লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা পাচ্ছে। তবে সৌদি আরব বা এসব মিত্রদের কেউ সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াবে না। 

সানা সেন্টার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন আল-এরিয়ানি মনে করেন, ইয়েমেনের দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে হুতিদের সামরিকভাবে পুরোপুরি পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব। বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ করাই একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প। 

প্রথম পরীক্ষার মুখে মক্কা চুক্তি 

রিয়াদে হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে বড় ধরনের নড়াচড়া দেখা দিয়েছে। গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি  এখন প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এই চুক্তির মূল কথা হলো, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা বাকি সব কটি দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। 

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা মারাত্মক হুমকির মুখে। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদির কারিগরি বা সামরিক প্রয়োজন মেটাতে আঙ্কারা পুরোপুরি প্রস্তুত। এর আগে পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানান, সৌদির নিরাপত্তায় পাকিস্তান যে কোনো সীমা পর্যন্ত যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

আরও পড়ুন

×