নিপাতনেই সিদ্ধ তবে পরিবেদন!

সমাজ

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মঈদুল ইসলাম

বিয়ের যোগ্যতার জন্য বয়সের সর্বনিম্ন সীমার আইন ছিল আদিকাল থেকে, আছে এখনও দেশে দেশে। তবে কার আগে কার বিয়ে, মানে আগে জ্যেষ্ঠের হবে, নাকি কনিষ্ঠের, সে ব্যাপারে অর্থাৎ বিয়ের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ক্রমের ধরাবাঁধা কোনো আইন নেই। যে গাছ আগে জন্মেছে তাতে আগে ফুল আসবে, যে বাছুর আগে জন্মেছে সে আগে বিয়োবে, যিনি আগে জন্মেছেন তাকেই আগে বুড়ো হতে হয়- জগৎ সংসারের এটাই নিয়ম। সেই নিয়মানুসারে আগে জ্যেষ্ঠের বিয়ে, তারপর কনিষ্ঠের বিয়ে সমাজের পুরোনো রীতি। সেই রীতি ভঙ্গ করে জ্যেষ্ঠের আগেই কনিষ্ঠের বিয়ে ঠিক চল না হলেও বিরল নয়। বিয়ের ক্ষেত্রে এই জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘনকর্মটি বাংলা অভিধানে 'পরিবেদন'রূপে অন্তর্ভুক্ত আছে। শব্দটি খাঁটি বাংলা নয়, এটি সংস্কৃত থেকে আসা তৎসম শব্দ, ভাববাচ্য বিশেষ্য পদ। 'মনু' (আমাদের দেশের বিশেষ একটি অঞ্চলের মনু নয়, প্রাচীন ভারতের শাস্ত্রকার ঋষি মনু) বিয়ের ক্ষেত্রে এই জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘনকর্মকে 'পরিবেদন' বলে অভিহিত করেছেন এবং এই বিয়ের কন্যাদান ও পৌরোহিত্যকর্মকে 'ব্রাত্যতা' (হীনকর্ম) বলে অভিহিত করেছেন। (শ্লোক ৬১, একাদশ অধ্যায়, মনুসংহিতা) বিয়ের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘনে এখন ফাঁসি দূরে থাক, মোবাইল কোর্টে ২০০ টাকা জরিমানারও আইন নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মনুর বিধান ছিল ফাঁসির চেয়েও কড়া! মনুসংহিতার তৃতীয় অধ্যায়ে ১৭১ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে-'দারাগ্নিহোত্রসংযোগং কুরুতে যোহগ্রজে স্থিতে।/পরিবেত্তা স বিজ্ঞেয়ঃ পরিবিত্তিস্তু পূর্ব্বজঃ।' অর্থাৎ জ্যেষ্ঠ ভাই অবিবাহিত ও অনগ্নিক থাকতেই যখন কনিষ্ঠ পত্নী পরিগ্রহ ও অগ্নিগ্রহণ করে, তখন কনিষ্ঠ ভাইকে পরিবেত্তা ও জ্যেষ্ঠ ভাইকে পরিবিত্তি বলে। এরপরে ১৭২ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে-'পরিবিত্তিঃ পরিবেত্তা যয়া চ পরিবিদ্যতে।/সর্ব্বে তে নরকং যাস্তি দাতৃযাজক পঞ্চমাঃ।' অর্থাৎ ওই বিয়ের পরিবিত্তি, পরিবেত্তা, পরিবেদনীয়া কন্যা, কন্যাদাতা ও পুরোহিত- এই পাঁচজনেরই নরকবাস হবে। ছাড় নেই কারও! বিবাহসুখবঞ্চিত জ্যেষ্ঠের আর নরকবাসের বাকি থাকে কী! তবু সান্ত্বনা, মনু সর্বাত্মক নরক বিধান দিয়ে গেছেন!

একেবারে ঠিক পরিবিত্তির অভিজ্ঞতা না হলেও যাত্রী হিসেবে নিশ্চয়ই যাতনা টের পেয়ে থাকবেন, যখন আগে আসা আপনার ট্রেনকে স্টেশনে আটকে রেখে পরে আসা ট্রেনটি আপনার চোখের সামনে দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে আগে ছেড়ে যায়! এর যে মর্মযাতনা তা 'পরিবেদনের' চেয়ে কম কীসে? সেটা নাকি রেলের নিয়ম- 'ফার্স্ট ইন লাস্ট আউট' (এফআইএলও)। কারবারেও নাকি এ রকম কারসাজি আছে- 'লাস্ট ইন ফার্স্ট আউট' (এলআইএফও)। এগুলোকেও এক রকমের ক্রম অনুসরণ বলে হয়তোবা চালিয়ে দেওয়া যায়!

বাংলা লেখাজোখায় 'পরিবেদন' শব্দটির ব্যবহার সচরাচর চোখে পড়ে না। তাই বলে 'কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই' ব্যাপার কিন্তু তেমন নয় মোটেও! গোয়ালে না থাকলে কী হবে? মাঠে আছে ঠিকই। ভাষায় ব্যবহার না হলেও কর্মটি আকসারই চলছে নানাভাবে নানা ক্ষেত্রে। জাকাতের লাইনে যিনি আগে দাঁড়িয়েছেন তিনিই তো আগে শাড়ি-লুঙ্গি পাবেন, রেলের টিকিটের লাইনে (সিনেমার টিকিটের লাইন, রেশনের লাইন এককালে নিজে দেখেছি, এখন কদাচ শোনা যায় না!) যিনি আগে দাঁড়িয়েছেন, তিনিই তো আগে টিকিট পাবেন। কিন্তু আমরা মানি নাকো কোনো লাইন, আইন! জাকাতের লাইনে পেছন থেকে আগে যাওয়ার কনুই ঠেলাঠেলিতে পড়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণই যাচ্ছে কতবার কতজনের, রেলের টিকিটের লাইনে সারারাত কাটিয়ে সকালবেলায় মুহূর্তেই কাউন্টারে টিকিট নিঃশেষের বার্তাহত কতজনের মর্মভেদী বিলাপ রোদনে বাতাস ভারি হচ্ছে। কোনো এক অদৃশ্য কায়দায় অগ্রবর্তীরও আগে টিকিট হস্তগত করে রাখেন কৌশলীজনরা। এসবের যে মর্মযাতনা তাই-বা পরিবেদনের চেয়ে কম কীসে! কায়দা করে অগ্রবর্তীকে অতিক্রম করার, টপকে যাওয়ার সুবিস্তৃত ক্ষেত্র তো আমাদের সড়ক, মহাসড়ক- অগ্রবর্তীকে কনুই ঠেলে টপকে যাওয়ায় অনির্বচনীয় সুখ! দুর্ঘটনায় যার প্রাণ যায় যাক।

সম্প্রতি ঢাকার এক সিটি করপোরেশনে জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘন করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের একজনকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ায় নাকি ওই করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে (প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর ২০১৯)। এও তো এক প্রকার পরিবেদনকর্মই বটে। যদিও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাত্র, পদোন্নতি এখনও দেওয়া হয়নি। ব্যাপারটা অনেকটা বিয়ের 'কাবিন' করে রাখার মতো বলে আঁচ করেছেন বোধহয় সেখানকার কর্মকর্তারা! সরকারি চাকরির পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতাক্রমের বিধিবদ্ধ বিধান রয়েছে বটে। আদালতে আমি দু'একজন ক্ষীণবুদ্ধির উচ্চমান সহকারী সেরেস্তাদার-পেশকার পেয়েছি, যারা নাজির পদের দায়িত্ব নিতে নারাজি হয়েছেন নাজির পদ থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। তারা মহাভারতের ভীষ্ফ্মদেবের মতো একেবারে 'পিতৃস্বার্থে' ভীষণ পণ করেছেন, তা হয়তো বলা যাবে না। তারা নাজির পদের ঝক্কির নগদ অসুবিধাটাই বড় করে দেখেছেন, লাভের দিকটায় মাথা খেলেনি।

সরকারি চাকরিতে যারা পদোন্নতিতে পিছিয়ে পড়েন ইংরেজিতে তাদের বলা হতো, এখনও বলা হয় 'সুপারসিডেড' আর এখন বাংলায় লেখা হয় 'পদোন্নতিতে অতিক্রান্ত'। এই অতিক্রান্ত ব্যক্তি পড়েন অব্যক্ত বিড়ম্বনাক্রান্ত অবস্থায়; বিধিসম্মত, রীতিসম্মত কারণ ছাড়া অতিক্রান্ত হলে তো পরিতাপ অতিশয়। এখন আবার চল দেখছি পদোন্নতির আগে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া। তাতে আর 'অতিক্রান্ত' লেখারও সুযোগ থাকে না বটে; কিন্তু যাতনা তো কিছু কম হয় না, যিনি অতিক্রান্ত হন তার। তবে এ রকম তো আরও কত অফিস-আদালতে হামেশাই ঘটে চলেছে, জ্যেষ্ঠকে কনুই ঠেলে টপকে কত বলবান কনিষ্ঠ পাচ্ছেন উচ্চ পদের দায়িত্ব, পদোন্নতি, নিয়োগ পেয়ে আসীন হচ্ছেন উচ্চাসনে। সেসবখানে তো দিব্যি সবাই সন্তুষ্ট চিত্তে কাজ করে চলেছেন! শরমে-মরমের যাতনা চেপে কিনা তার তত্ত্ব-তালাশের নয়! করপোরেশনে আবার ব্যতিক্রম দেখার কী হলো, ঠাওর করা যাচ্ছে না। আমাদের ছোটকালে কেউ টপকে গেলে পিছিয়ে পড়াদের সান্ত্বনার একটা কথা ছিল, 'আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে সোনা পায়'। হাঃ সোনা, কোথায় সে খনি, আর কোথায় সে সুন্দরবন! শরীরের যে বিশেষ অঙ্গের ভেতর যে কায়দায় স্বর্ণ আনার খবর দেখা যায়, তা কি আর যে সে লোকের কর্ম! তাই আবার পিছে পড়ে শুল্ক্ক গোয়েন্দা! তার চেয়ে যিনি টপকে গেলেন, তিনি থাকুন সেই বৃন্দাবনে, অতিক্রান্তের তো রইল 'বৃন্দাবনী সারং'- শুনতে পারেন, চাইলে গাইতেও পারেন।

বিয়ের বয়স হওয়া আর বিয়ের সময় হওয়া তো এক কথা নয়। তবে সময় গেলে সময় পাওয়া যায় না। তাই সময়ের অপেক্ষায় থাকা মোটে ভালো কাজ নয় বলবানদের। আমার মতে, ভাবার্থে সব ধরনের জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘনকর্মকেই পরিবেদন বলা চলে। কিন্তু এই কলির যুগে তো আর মনুর বিধান চলে না! জ্যেষ্ঠতাক্রম লঙ্ঘন, ভাবার্থে পরিবেদনই যখন চল হয়ে যায়, তখন তা ব্যাকরণের ভাষায় 'নিপাতনে সিদ্ধ'। আর আইনের ভাষায় 'ফ্যাক্টাম ভ্যালেট' হয়ে যায়! তার ওপর, জ্যেষ্ঠকে বিবাহসুখবঞ্চিত করে স্বয়ং পিতাই যখন অপত্য স্নেহাধিক্যে কনিষ্ঠের বিবাহকর্ম আগে সমাধা করার ব্রাত্যতা করেন, তখন জ্যেষ্ঠের যে মর্মযাতনা, যে বিড়ম্বনা তাকে বলা যায় 'পরিবেদনা'! আর তার সেই পরিবেদনায় যখন কাকেরাও 'ক্যামনও' করে না, তখন তাকে বলা যায় 'কাকস্য পরিবেদনা'!

সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)
[email protected]