জনসংখ্যা নীতি নিয়ে আত্মঘাতী অবহেলা

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. মইনুল ইসলাম

২২ নভেম্বর দি ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত জনসংখ্যা নীতি নিয়ে ওই পত্রিকার উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত একটি খবর আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে :দেশের জনসংখ্যা নীতি যুগোপযোগী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে সর্বোচ্চ জাতীয় কমিটি রয়েছে, সে কমিটি নাকি ২০১০ সালের পর একবারও সভায় মিলিত হয়নি। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতি প্রধানমন্ত্রীর দারুণ অবহেলার শিকার হয়ে রয়েছে। এই আত্মঘাতী অবহেলা কেন? শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে যেভাবে জনসংখ্যা পরিকল্পনা কার্যক্রমকে অনেকখানি গুটিয়ে ফেলা হয়েছে, তার যুক্তি কী? প্রচারমাধ্যমগুলো এই বিষয়টিকে এখন আর গুরুত্বই দিচ্ছে না এ কার্যক্রমের পেছনে ব্যয়িত অর্থায়ন প্রবাহটি শুকিয়ে যাওয়ায়। এমনকি যেসব এনজিও পরিবার পরিকল্পনাকে উৎসাহিত করত, তাদেরও নাকি সরকারের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে! প্রধানমন্ত্রী কয়েকবার বলেছেন, তিনি এই বিপুল জনসংখ্যাকে কোনো সমস্যাই মনে করেন না। বরং বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ যে বর্তমান পর্যায়ে ১৫-৪৫ বছরের তরুণ-তরুণী ও যুবক, তার ফলে উদ্ভূত 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বাংলাদেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি অংশত ইতিবাচক হলেও এত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে জনসংখ্যা পরিকল্পনাকে অবহেলা করা মারাত্মক ভুল।


২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যাকে মারাত্মকভাবে কম (১৬ কোটিরও কম) দেখানোর অভিযোগ ওঠার পর বিআইডিএসের পুনর্গণনা জরিপে প্রমাণিত হয়েছিল যে, দেশের উল্লেখযোগ্য অনুপাতের খানায়-বাড়িতে কোনো গণনাকারী আদৌ যায়নি। ২০১৯ সালে সরকারিভাবে দেশের প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৭ কোটির নিচে রয়েছে দাবি করা হলেও প্রকৃত জনসংখ্যা হয়তো ১৮ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ এবং বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ। বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে যে দৃঢ়মূল উদ্বেগ পরিলক্ষিত হতো, তার পেছনে কৃষিজমির তুলনায় জনসংখ্যার এই অতি-ঘনত্বকে দায়ী করা হতো। তাই এ দেশে জনসংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি সমস্যার আসল চেহারাকে লুকোনোর অপপ্রয়াস, যা ফাঁকিবাজি। আরেকটি বিষয়ও জনসংখ্যার সঠিক চিত্র পেতে দিচ্ছে না- তা হলো, বাংলাদেশিদের অভিবাসন প্রবাহ। মনে রাখতে হবে, চারটি পরিমাপের যোগ-বিয়োগের মাধ্যমে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার হিসাব করা হয় : মোট জন্মহার, মোট মৃত্যুহার, বিদেশ থেকে দেশে বছরে মোট অভিবাসন এবং দেশ থেকে বিদেশে বছরে মোট অভিবাসন। [জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার=(মোট জন্মহার-মোট মৃত্যুহার)+(বিদেশ থেকে দেশে বছরে মোট অভিবাসন-দেশ থেকে বিদেশে বছরে মোট অভিবাসন)]। এই পরিমাপে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের সব দেশে অভিবাসনকে বিবেচনা করার নিয়ম থাকায় বাংলাদেশের সরকারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বিপুল জনসংখ্যার অভিবাসন ও দেশান্তরকে সঠিকভাবে গণনায় না আনার চালাকি করে চলেছে নানা কারণে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিংবা দক্ষতার ঘাটতির চাইতেও সরকারগুলোর রাজনৈতিক বিবেচনা ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণ, বাংলাদেশ থেকে ভারতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বহির্গমন প্রবাহকে বাংলাদেশ সবসময় কম করে দেখাতে চায়। কারণ, বাংলাদেশের হিন্দুরা যে এ দেশে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশত্যাগ করছে, এটি এ দেশের কোনো সরকারই স্বীকার করতে চায় না। অথচ এ দেশ থেকে ভারতে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বহির্গমন অব্যাহত থাকায় হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত কমতে কমতে ১৯৪৭ সালের ২২ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে মাত্র ৯ শতাংশের কাছাকাছি এসে গেছে। তেমনিভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা সরকারিভাবে বলা হয় ৯০ লাখ থেকে এক কোটি, প্রকৃত সংখ্যা আরও প্রায় ৩০ লাখের বেশি হবে বলে এতদসম্পর্কীয় গবেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে যথাসম্ভব দ্রুত ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের চতুর্থ পর্যায়ে মানে 'স্থিতিশীল জনসংখ্যা'র স্তরে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বকে আমরা অস্বীকার করছি কেন? জবরদস্তির পথে না গিয়েও যে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব, সেটি প্রমাণ করেছে শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ভারতের কেরালা, পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্য। মানুষকে সুশিক্ষিত ও সচেতন করতে পারলে, সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা হলে, শিশুমৃত্যুর হার এবং মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারলে, বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেলে এবং জন্মনিরোধ পদ্ধতিগুলো সুলভে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলে জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের পরিবার ছোট করতে উদ্বুদ্ধ হয়- এই সত্যটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন তত্ত্বের দ্বিতীয় পর্যায়ে (আরলি এক্সপান্ডিং ফেইজ) প্রবেশ করেছিল, যেটাকে 'জনসংখ্যা বিস্ম্ফোরণের পর্যায়' হিসেবে অভিহিত করা হয়। ওই পর্যায়ে এ দেশে জনসংখ্যা প্রায় ২.৫ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে। ফলে ১৯৫১ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যেই দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, ২০০০ সালে ওই জনসংখ্যা আবারও দ্বিগুণ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে হেনরি কিসিঞ্জার 'আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি' আখ্যায়িত করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল। ওই সময়ের সাত কোটি মানুষকে আমরা খাদ্য জোগানোর সক্ষমতা অর্জন করতে না পারায় বিশ্বব্যাপী বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, ওই জনসংখ্যা আবারও যখন পরবর্তী ২৫-৩০ বছরের মধ্যে ১৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে, তখন ভূমি-দরিদ্র ঘনবসতির এ দেশে জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশ্বের জনগণের কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ধরনা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর রচিত ফালান্ড ও পার্কিন্সনের বিশ্বখ্যাত বইয়ের মূল শিরোনামে বাংলাদেশকে 'এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট' আখ্যা দেওয়া হয়েছিল এত ঘনবসতিপূর্ণ একটা খাদ্য ঘাটতির দেশে আদৌ অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না আশঙ্কা প্রকাশের জন্যই। জনসংখ্যা-তাত্ত্বিকদের মনোযোগ এখন নিবদ্ধ হয়েছে জনসংখ্যা বিস্ম্ফোরণের দ্বিতীয় পর্যায় কীভাবে সংক্ষিপ্ত করে বিভিন্ন জনবহুল দেশ দ্রুত তৃতীয় পর্যায়ের 'লেইট এক্সপান্ডিং ফেইজ'-এ প্রবেশ করতে পারে, সে প্রয়াসে। এই তৃতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে জন্মহার এবং মৃত্যুহার উভয়ই স্বাভাবিকভাবে কমতে থাকলেও এই দুটি হারের পার্থক্য বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে দ্রুত কমিয়ে আনায় সাফল্য অর্জন করতে পারলে জনসংখ্যা নিয়ে আর আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কারণ থাকে না। ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের চতুর্থ স্তরে জনসংখ্যা স্থিতিশীল হয়ে যায়। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি তখন কোনো দেশের জন্য সমস্যা থাকে না, জনসংখ্যা সমস্যা অন্যরূপ ধারণ করে। আশির দশকেই বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং গত চার দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমানোয় আমাদের সাফল্যও উল্লেখযোগ্য। অবশ্য বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন ১.৩ শতাংশে নেমে গেছে বলে সরকার দাবি করলেও জাতিসংঘের জনসংখ্যা-সম্পর্কিত সংস্থা ইউএনএফপিএর জরিপ অনুযায়ী তা ১.৪২ শতাংশে রয়ে গেছে বলা হচ্ছে। এ দেশের টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা মোট প্রজনন হার সত্তর দশকে ছিল ৬.৩, মানে একজন নারী তার সারা জীবনে ক'জন সন্তানের জন্ম দেন, তারই প্রাক্কলিত পরিমাপ এটি। এই হার কমে এখন ২.৩-এ দাঁড়িয়েছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। কিন্তু এই হারকে গত এক দশকে আর কমানো যায়নি, যা একটি বিপদসংকেত। এটিকে ২-এর নিচে নামাতেই হবে, যদি আমরা জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে এক শতাংশের নিচে নামাতে চাই। এর অন্যথা হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোমেন্টাম ২০৩০ সালের পরও এ দেশের জনসংখ্যাকে বাড়াতেই থাকবে।

গণচীনের মতো জবরদস্তিমূলক নীতি না নিয়েও বর্তমান বিশ্বে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কমবেশি সফলতা অর্জনকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর বিপরীতে নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তেমন একটা কমাতে সক্ষম না হওয়ায় এই দুটি দেশের জনসংখ্যা বেড়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে ইতোমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। বাংলাদেশকে হটিয়ে নাইজেরিয়া সম্প্রতি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হয়ে গেছে, যে দেশটি ২০৫০ সালে চতুর্থ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার ১.৩ শতাংশ কিংবা ১.৪২ শতাংশ যা-ই হোক, সেটি নিয়ে আত্মতৃপ্তির কোনো অবকাশ নেই। দেশের জনসংখ্যার মোট প্রজনন হারকে আগামী দশ বছরের মধ্যেই ২ শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে হলে (মানে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হারকে ১ শতাংশের নিচে নামাতে হলে) 'ছেলে হোক বা মেয়ে হোক এক দম্পতির দুই সন্তানের বেশি নয়' নীতিকে আমাদের জনসংখ্যা নীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। দুই সন্তানের বেশি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক দম্পতিদের সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করার জন্য নানা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা যেন আর বিলম্ব না করি।
 
অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়