মমেক হাসপাতালে আগুন
পদদলিত হয়ে চারজনের মৃত্যুর দাবি পরিবারের
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুনের পর লোকজনের ভিড়
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুন লাগার পর পদদলিত হয়ে চারজন মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। অন্য দুজনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। গত সোমবার সন্ধ্যায় এই দুর্ঘটনার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল মঙ্গলবারও হাসপাতালের পরিস্থিতি ছিল থমথমে। লিফট বন্ধ থাকায় এবং একটি মাত্র সিঁড়ি খোলা থাকায় বৃদ্ধ, শিশুসহ গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওঠানামা করাতে স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এদিকে সময় যত গড়াচ্ছে, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র ততই স্পষ্ট হচ্ছে। অব্যবস্থাপনার কারণে অগ্নিকাণ্ড ও জরুরি নির্গমনের পথসহ কয়েকটি সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন রোগী, তাদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠন করা তদন্ত কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। অভিযোগ উঠেছে, তাদের গাফিলতির কারণেই হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শর্টসার্কিট ও অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট গিয়ে পৌনে এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুন ভয়াবহ রূপ না নিলেও ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
প্রাণহানির দাবি প্রশাসনের অস্বীকার
আগুন লাগার পর ধোঁয়ার কারণে ও আতঙ্কে হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা হুড়োহুড়ি করে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় একটি মাত্র সিঁড়িতে ভিড়ের চাপে পড়ে গিয়ে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন– ফুলবাড়িয়া উপজেলার পল্লিচিকিৎসক শাহজাহান মনির (৪৫), সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী (৩৮), তারাকান্দা উপজেলার কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং নেত্রকোনার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০)। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। এ ছাড়া একটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য মিললেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ প্রশাসন প্রাথমিকভাবে পদদলিত হয়ে ছয়জনের প্রাণহানির কথা বললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন দাবি করেছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণে সরাসরি কারও মৃত্যু হয়নি।
ফুলবাড়িয়ার নিহত শাহজাহান মনিরের স্ত্রী হারিসা বেগম বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে স্বামীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভিড়ের মধ্যে পড়ে যাই। ধস্তাধস্তিতে আমার স্বামী অচেতন হয়ে মারা যান।’ নিহত কুলসুম আক্তারের মেয়ে মিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সিঁড়িতে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। মাকে ভিড়ের মধ্য থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। সময়মতো চিকিৎসা পেলে আমার মা বেঁচে যেতেন।’
পাঁচটির মধ্যে চার সিঁড়িই তালাবদ্ধ
হাসপাতালের নতুন ভবনটিতে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিতেই গ্রিল দিয়ে তালা ঝুলিয়ে রেখেছিল। একটি মাত্র খোলা সিঁড়ি দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ওঠানামা করে। আগুন লাগার পর আতঙ্কিত মানুষ সেই একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করে। সিঁড়িতে মানুষের চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ধাক্কাধাক্কিতে অনেকেই পড়ে যান। বাধ্য হয়ে কয়েকটি সিঁড়িতে রোগী ও স্বজনরা গেট ও তালা ভেঙে বের হন। গতকাল সকালে সিঁড়ির গেটে মরিচা ধরা পুরোনো তালা ঝুলতে দেখা যায়, আবার কোথাও দেখা যায় ভেঙে ফেলা গ্রিল।
স্থানীয় আবুল কালাম আল আজাদ সমকালকে বলেন, ‘চারটি সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি। আগুন না লাগলে বা নির্গমন পথ খোলা থাকলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না। এই দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।’
তদন্ত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ
আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মঙ্গলবার পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। তবে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে কমিটির দুজন সদস্যকে নিয়ে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অবহেলা ও দুর্নীতিকে এই লিফট দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন অনেকে। সেই গণপূর্তের ময়মনসিংহ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মাজেদুর রহমানকে তদন্ত কমিটির দুই ও তিন নম্বর সদস্য করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈনউদ্দিন খান।
সম্প্রতি সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল এই হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থারের চরম দুর্নীতির চিত্র। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গণপূর্তের অসাধু প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’-এর যোগসাজশে প্রতিবছর লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেটর নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে লিফটের ‘অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস’ (এআরডি) অকেজো করে রাখা হয়েছিল এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল।
তদন্ত কমিটিতে নিজেদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, ‘কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমাদের কাজ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা।’ তবে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গাফিলতি আড়াল করতেই তড়িঘড়ি করে গণপূর্তের কর্মকর্তাদের তদন্ত কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।
রোগী ও স্বজনদের দাবি, অবিলম্বে তালাবদ্ধ রাখা সবকটি সিঁড়ি সার্বক্ষণিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে, লিফট ব্যবস্থাপনা গণপূর্তের দুর্নীতিবাজ চক্রের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিহতদের বাড়িতে শোকের মাতম
হাসপাতালে আগুন লাগার পর হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে প্রাণ হারানো শাহজাহান মনিরের ফুলবাড়িয়ার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারিয়ে দিশেহারা পুরো পরিবার। মঙ্গলবার গ্রামে গিয়ে দেখা যায় পল্লিচিকিৎসক মনিরের মা হাওয়া খাতুন বারান্দায় বসে বিলাপ করছেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার কলিজার টুকরা বাড়িতে ঠিকই আইলো, কিন্তু লাশ হইয়া আইলো। আমারে এহন কেডা ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইবো?’ পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় মনিরকে। সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতেন।
ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালক রমজান আলীর বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। রমজান আলীর ডেথ সার্টিফিকেট ও গেটপাস হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আগুনের আতঙ্কে সিঁড়িতে আটকা না পড়লে আমার স্বামী এভাবে মারা যেত না।’ এদিকে তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামে কুলসুম আক্তারের বাড়িতে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার হাজেরা বেগমের স্বজনরা বলছেন, হাসপাতালের সব সিঁড়ি খোলা থাকলে হয়তো এভাবে প্রাণহানি ঘটত না। তারা এ জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
আগুন লাগার পর মৃত্যু প্রসঙ্গে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘যারা এই হাসপাতালে মারা গেছেন, তারা কীভাবে মারা গেছেন এটি তদন্তে উঠে আসবে। এক হাজার বেডের হাসপাতালে আমরা প্রতিদিন চার হাজার রোগীকে সেবা দিই। তাদের সঙ্গে আরও চার গুণ দর্শনার্থী থাকে। বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দিতে আমরা হিমশিম খাই। জনবল ও সিকিউরিটির লোকজনের ঘাটতি থাকায় আমাদের কয়েকটি সিঁড়ি বন্ধ রাখতে হয়। লিফট মেরামতের কাজ আগে থেকেই চলমান ছিল। এত বড় বিপর্যয়ের মাঝেও আমাদের চিকিৎসাসেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।’
- বিষয় :
- আগুন
- পদদলিত
- পদদলিত হয়ে নিহত
- মমেক