ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বাজার নিয়ন্ত্রণে নীরবতা কার স্বার্থে

বাজার নিয়ন্ত্রণে নীরবতা কার স্বার্থে
×

রুস্তম আলী খোকন

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০

করোনাকালে আগের দুই কোটি অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও এক কোটি ৬০ লাখ। গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস বলছে, অতি দরিদ্রের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে। এমতাবস্থায় হুহু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। সর্বশেষ অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি সাত টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে আমদানিকারকদের সমিতি। এক লিটার সয়াবিনের দাম এখন ১৬০ টাকা। দোকানে যখন কিনতে যাবেন তখন আরও পাঁচ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ১৬৫ টাকা লিটার।
অতি দরিদ্রের সংখ্যা বাদই দিলাম। নিম্নবিত্তের সীমা অতিক্রম করে মধ্যবিত্তের জীবনে নাভিশ্বাস। খোলা ট্রাকে যে চাল-ডাল বিক্রি করা হয়, সেখানে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। এমন অনেককেই সেই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, যারা সচরাচর খোলা ট্রাকে পণ্য কিনতে অভ্যস্ত নন।
জুলাই মাসের ২১ তারিখ ফুলবাসী নামের এক দরিদ্র নারী স্বামীর হাতে নিহত হন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে। অভাবের সংসারে স্বামী কালু চন্দ্র দাস জীবন অতিবাহিত করতে না পেরে এই পথ বেছে নিয়েছিল। জুলাই মাসের চেয়ে বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি আরও খারাপ।
চালের দাম বেড়েছে এক বছরে ১০ শতাংশ। পেঁয়াজের ঝাঁজ বাড়ছে। আটা, লবণ, আদা, রসুন সবকিছুর দাম বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কেন এমন হচ্ছে- কারও কোনো বক্তব্য নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে আমরা সবকিছুকে মুক্ত করে দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের পর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অভিমুখে মুখ করে যে অর্থনীতি আমরা সাজিয়েছিলাম, তা অঙ্কুরেই নষ্ট করে দিয়েছি।
জনগণের জন্য টিসিবি নামক প্রতিষ্ঠান ছিল। তার আওতায় ন্যায্যমূল্যের দোকান ছিল। দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় আমরা তা বন্ধ করে দিয়েছি। তারপর আবার শুরু করলেও তা এত সীমিত যে বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকাই রাখে না।
আমাদের সরকারের কোনো নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা নেই। পরিবহন খাত পুরোটাই গড়ে উঠেছে বেসরকারি খাতে। কোনো কারণে ট্রাক কিংবা লরি ধর্মঘট হলে বাজারমূল্য বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভর দেশে শুধু ভোজ্যতেলের বাজার বার্ষিক ৫২.২৭ লাখ টন। এর মধ্যে সয়াবিন প্রায় ৪৬ লাখ টন, যার পুরোটাই আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে। পণ্যের দাম নির্ধারণে এখন আর সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয় আমদানিকারকরা। বাজারে কারসাজি হয়। হয় মজুদদারি। কৃষক কৃষিপণ্যের দাম পান না। অথচ ভোক্তা স্বল্পমূল্যে পণ্য পায় না।
এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ইঙ্গিত দিয়েছেন তেলের দাম বৃদ্ধির। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার তেলের দাম বাড়াবে। এলএন গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম ছিল। সরকার সেই সময়ে জ্বালানি তেল থেকে ব্যাপক মুনাফা করেছে। করোনাকালে আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছিল। ডলারের রিজার্ভ বেড়ে গেছে। মহামারির ভরা দুর্যোগে বিশ্বে তেলের দাম খুবই কম ছিল, এমনকি তেলের বাজার এমন স্থানে নেমে যায় একপর্যায়ে উৎপাদনকারী দেশ এবং কোম্পানিগুলো তেল ফ্রি দিতে চেয়েছে- এমন সংবাদও বিশ্ব গণমাধ্যম আমাদের জানিয়েছিল। আমরা কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি। মাথাপিছু আয় বেড়ে দুই হাজার ১৩৮ ডলার, যা গত কয়েক দিনে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতকে ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ডলারের দাম ৯০ টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।
করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসতে পারে, মহামারি-পরবর্তী সময়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে- এমন আশঙ্কা জাতিসংঘের তরফ থেকে ছিল। তারপরও কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি যে নেওয়া হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল জনমানুষের সমস্যাকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা করে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবেশ ও জলবায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তেমন কথাই তারা বলেন না। রাজনীতির মূল স্রোতধারা দোষ-দায় চাপানো, ঝগড়াঝাঁটির নিম্ন ও দুর্বল চক্রে আবদ্ধ।
গরিব মানুষ উৎপাদন করে। সারাবিশ্বে বৈধ-অবৈধভাবে এক কোটি ২৯ লাখ প্রবাসী সকাল-সন্ধ্যা শ্রম বেচে ডলার পাঠায়। মাথাপিছু আয় বাড়ে, সেই সঙ্গে বাড়ে ক্ষুধা।
মহামারির মধ্যেই আছি আমরা। জাতিসংঘ বলছে, আবার আঘাত হানতে পারে করোনা। এশিয়ায় সংক্রমণের হার বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, শীতে করোনা বাড়তে পারে। অস্বাভাবিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সমন্বিত পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হওয়া জরুরি। করোনা মহামারি মোকাবিলার পাশাপাশি করোনা মধ্য ও পরবর্তী অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবন, নিরাপত্তা ইত্যাদি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা রাষ্ট্রের জন্য জরুরি।
যেহেতু রাজনীতিকদের বড় অংশ রাজনীতি নিয়ে চিন্তাই করেন না, সেহেতু এই ভাবনা ও করণীয় নিয়ে সমাজের অভ্যন্তরে বসবাস করা নাগরিকবৃন্দ করণীয় নির্ধারণে নির্দেশনা প্রস্তুত করতে পারেন। কিছু কাজ এবং দায়িত্ব যদি আমরা নিজেরাই পালন করতে পারি, তার উদ্যোগও নেওয়া যায়।
সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×