ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

অপ্রতিমের মতো মৃত্যু আর একটিও নয়

অপ্রতিমের মতো মৃত্যু আর একটিও নয়
×

ফাতেমা রেজিনা ইকবাল

ফাতেমা রেজিনা ইকবাল

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪২

যে কোনো হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া কষ্টকর। কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড আরও বেদনাদায়ক। স্কুলছাত্র মা-বাবার একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যায় সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। সন্তানের এমন মৃত্যু কোনো মা-বাবাই সইতে পারেন না। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড আমাদের শিশুদের ওপর নৃশংসতার বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে শিশু কোথাও যেন নিরাপদ নয়।

অপ্রতিমের আগে রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডে নাগরিকদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি। একেকটা ঘটনার পেছনে একেক ধরনের কারণ থাকে বটে। শেষ পর্যন্ত শিশুরাই ভিকটিম। অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। আমরা চাই এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসুক। কোনো শিশু যাতে আর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

আগে আমাদের সমাজে বড় পরিবার বা যৌথ পরিবারের প্রাধান্য ছিল। সে সময় শিশুরা দাদা-দাদি বা নানা-নানির স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে উঠত। তাদের কাছে গল্প শুনে, খেলাধুলা করে আনন্দময় সময় কাটাত। বয়স্কদের এই সান্নিধ্য শিশুদের কেবল একা লাগতে দিত না, বরং তাদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক মেলবন্ধনের ভিত্তি তৈরি করত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একক পরিবারের প্রচলন বেড়েছে। বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রায় বাবা-মা দুজনকেই প্রায়শ জীবিকার তাগিদে কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে শিশুরা এক ধরনের একাকিত্বে ভুগতে শুরু করে। 

শৈশবের সেই কোলাহল আর পারিবারিক আবেগ-অনুভূতির অভাব পূরণ করতে গিয়ে তারা অনেক সময় ডিজিটাল স্ক্রিন বা প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই সামাজিক পরিবর্তন আমাদের শিশুদের মানসিক বিকাশ ও পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এটাও সত্য, সময়ের প্রয়োজনে ডিজিটাল ডিভাইসকে এখন অস্বীকারের সুযোগ নেই।

পড়াশোনাও এখন ডিভাইসকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আগে আমরা ডিকশনারি দেখে শব্দের অর্থ বের করতাম। এখন অনলাইনে সার্চ দিলে শব্দের বিস্তারিত তথ্য সুন্দরভাবে চলে আসে। ফলে মোবাইল কিংবা ডিভাইসের কারণেই অপরাধ বাড়ছে– তা বলা যাবে না। তবে শিশুদের প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয় আছে। ডিভাইস কতটুকু সময় তারা ব্যবহার করবে, অতিরিক্ত আসক্তি যাতে পেয়ে না বসে ইত্যাদি। সময়ের কারণে প্রযুক্তিকে একেবারে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে এটি আবার আমাদের পিছিয়েও দিতে পারে।

সন্তান যখন কিছুটা বড় হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায়, তখন সামাজিকীকরণের তাগিদ থেকেই তাকে সহপাঠী, শিক্ষক তথা মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। সব মা-বাবাই চান তাদের সন্তান ভালো পরিবেশে থাকুক। ভালো মানুষের সঙ্গে মিশুক। অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, পুলিশ যেমনটা বলছে, তার ফোনের জন্য ছেলেটিকে হত্যা করা হয়। যারা হত্যা করেছে, তারা কোনো সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন হতে পারে না। স্বস্তির বিষয় যে, পুলিশ তাদের ধরতে পেরেছে।

আমাদের শিশুদের সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিবারের বাইরে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ার কাজ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে শিশুরা তাদের সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় মাঠ থাকতে হবে, যাতে বাচ্চারা স্বচ্ছন্দে খেলতে পারে। সেখানে লাইব্রেরি থাকবে এবং শিশুদের বয়স উপযোগী বই থাকবে। তারা বই পড়বে এবং নানামুখী সৃজনশীল কাজে শিশুদের ব্যস্ত রাখতে পারে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই। তখন দেখা যাবে, শিশুদের সময়টাও ভালো কাটবে।

একটা হত্যাকাণ্ড যখন ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার বিষয় চলে আসে। অপ্রতিম হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে এটি উদাহরণ হিসেবে সামনে থাকবে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্য যেমব সামাজিক মাধ্যম আছে, সেখানে শিশু সুরক্ষায় সচেতনতার প্রচার দরকার। শিশুকেন্দ্রিক আমাদের ভালো ভালো আইন আছে। সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়নও পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করবে।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর লাশ পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রামিসা-আছিয়াদের নির্মম পরিণতিও আমরা দেখেছি। এসব বেদনাদায়ক পরিসংখ্যান আমাদের শঙ্কিত করে। যদিও কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার অঙ্গীকার করে গেছেন। এ দায়িত্ব আমাদের সবার– শিশুদের কীভাবে একটা সুন্দর পৃথিবীতে আমরা বড় করতে পারি, তাদের সুরক্ষায় প্রত্যেকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে এটি অসম্ভব নয়। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের জন্য বাসযোগ্য দেশ গড়া আজ জরুরি।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড যেভাবে আমাদের নাড়া দিয়েছে; আমরা যদি সোচ্চার থাকি তবে শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা হয়তো সহজ হবে। আমরা আর কোনো শিশুর এমন নির্মম মৃত্যু দেখতে চাই না। কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।

ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন

×