বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর পার করছি আমরা। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসে যে নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমরা আজও তাদের সম্মান করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের সম্মান করবে। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। এখানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান মর্যাদার অধিকারী হওয়ার কথা। আমাদের সংবিধান সে অধিকার দিয়েছে। যারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা জাতিগতভাবে পিছিয়ে আছেন, তাদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করার নির্দেশনাও আছে আমাদের সংবিধানে। এই রাষ্ট্রে কেউ অন্যের অধিকার খর্ব করতে পারেন না; কাউকে অসম্মান করতে পারেন না।
রাজনৈতিক সংলাপ কিংবা সাধারণ আলোচনা, যা-ই হোক না কেন; আমাদের সভ্যভাবে কথা বলতে হয়। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রেখে কথা বলতে হয়। কারও উদ্দেশে কেউ অশ্নীল ভাষা প্রয়োগ করবে, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রাজনীতিবিদরা তো তা করতেই পারেন না। কিন্তু আমরা দেখলাম, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল; যে দলটি মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দল ডা. মুরাদ হাসান নামে এমন এক ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার পথ সুগম করে দিয়েছে। তাকে মন্ত্রিসভায়ও স্থান দেওয়া হয়েছে, যিনি সভ্য ভাষায় কথা বলতে জানেন না; নারীর প্রতি যার নূ্যনতম সম্মানবোধ নেই। সরকারপ্রধান নারীদের এগিয়ে নিতে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, ডা. মুরাদের নারীবিদ্বেষী বিভিন্ন মন্তব্য তার সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।
গত কয়েক দিন ধরে ডা. মুরাদ হাসান যে ভাষায় নারীদের আক্রমণ করেছেন, তাতে এটা স্পষ্ট- তিনি মানুষ হিসেবে সুস্থ, স্বাভাবিক ও সভ্য নন। তিনি নারীদের সম্মান করতে জানেন না। যে ব্যক্তি নারীকে সম্মান করতে জানেন না; আমার বিশ্বাস, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান করেন না। তিনি তার নারী সহকর্মীদের, তার মা, স্ত্রী ও কন্যাকেও সম্মান করেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করেও পার পেয়ে যাচ্ছিলেন ডা. মুরাদ হাসান। একজন রাজনীতিক ও তার নাতনিকে নিয়ে তিনি যেসব শব্দ উচ্চারণ করেছেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সে যাত্রায় তিনি কিছু সমালোচনার মুখে পড়েছেন বটে, কিন্তু পরে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অশ্নীল, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। আমরা কল্পনাও করতে পারি না- রাষ্ট্রের একজন প্রতিমন্ত্রী এতটা অশ্নীল ভাষায় কাউকে আক্রমণ করতে পারেন! ফোনকলে তিনি যে ভাষায় একজন অভিনেত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন; প্রয়োজনে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা পাঠিয়ে তুলে আনার কথা বলেছেন, তা নারী সমাজকে ভীত-সন্ত্রস্ত না করে পারে না। তার এমন হুমকির পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কী প্রতিকার করেছে? এই প্রতিমন্ত্রীকে ধিক্কার জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই।
ডা. মুরাদ হাসানের অশ্নীল ও উস্কানিমূলক মন্তব্য নারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তিনি শুধু নারীদের অপমানই করেননি, বরং সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন; আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। এমন একজন মানুষের সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্যরা কীভাবে কাজ করতেন! বর্তমান সংসদে ৭০ জন নারী সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদেও একাধিক নারী রয়েছেন। আমি তাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, তারা ডা. মুরাদ হাসানের বিষয়ে কী ভাবছেন? তাদের কি কিছুই করার ছিল না?
সম্প্রতি এক প্রভাবশালী নেতাকে দল থেকে বহিস্কার করেছে আওয়ামী লীগ, যিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির অনেক নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিতর্কিত ও অপরাধকর্মে জড়িত থাকার নানা তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিতর্কিতদের ব্যাপারে বলা হয়, তারা অন্য দল বা ভিন্ন আদর্শ থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- আসলেই কি তারা অনুপ্রবেশ করেছেন, নাকি তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে? যদি তারা অনুপ্রবেশ করেও থাকেন, তাহলে কেন তাদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে কিংবা মন্ত্রিপরিষদে স্থান দেওয়া হচ্ছে? প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নীতিমালা, সেখানে জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার বিধান অবশ্যই থাকে। আওয়ামী লীগে কি সেই নীতিমালা মানা হচ্ছে না? কোনো সংকট বা দুর্বলতা না থাকলে ডা. মুরাদ হাসানের মতো ব্যক্তি কীভাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান? আওয়ামী লীগে ডা. মুরাদ হাসানের মতো লোকের সংখ্যা অনেক- এটা আমি বিশ্বাস করি না। তবে দলটির ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন নেতারা পিছিয়ে পড়ছেন এবং বিতর্কিতরা নেতৃত্বে আসছেন- এটা খোদ আওয়ামী লীগ নেতারাও বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন এবং এ জন্য ক্ষোভ জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিশ্নেষণ করা দরকার, তারা কীভাবে নেতা নির্বাচন করবে।
আমরা দেখছি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তুচ্ছ বিষয়ে অনেক নাগরিককে হয়রানি করা হচ্ছে। কিন্তু ডা. মুরাদের বিভিন্ন অশ্নীল মন্তব্যের পরও তার ক্ষেত্রে এ আইন প্রয়োগ করা হয়নি কেন? সোমবার তীব্র সমালোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে তার পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। আমরা এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে শুধু পদত্যাগই তার শাস্তি হতে পারে না। আমাদের প্রত্যাশা- সরকার তাকে সংসদ সদস্যপদ থেকেও স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করবে। আওয়ামী লীগও তাকে বহিস্কার করবে। একই সঙ্গে তিনি যেহেতু উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, বক্তব্যের মাধ্যমে নারীর সম্মানহানি করেছেন এবং একজন নারীকে তুলে এনে ধর্ষণ করার হুমকি দিয়েছেন; সুতরাং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করারও দাবি জানাই। আর যদি তিনি পার পেয়ে যান তাহলে আমরা ধরে নেব, সরকার এবং আওয়ামী লীগ তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে।
ডা. মুরাদ হাসানের মতো মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন না। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনাও করা দরকার। দলে এমন অসভ্য কেউ থাকলে তাকে বের করে দেওয়া উচিত। অন্যথায় ডা. মুরাদরা ঘুরেফিরে ক্ষমতার সঙ্গে থাকার সুযোগ পাবেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন, নারীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াবেন। আমাদের রাজনীতিতে তারাই কদাচারের সৃষ্টি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিকারই একমাত্র প্রতিবিধান।
খুশী কবির :সমন্বয়ক, নিজেরা করি