বাজার
মুক্তবাজার অর্থনীতি ও অদৃশ্য হাতের কারসাজি
রুস্তম আলী খোকন
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২২ | ১৭:০১
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছেই। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। দৃশ্যত টিসিবির মাধ্যমে খোলা ট্রাকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে কয়েকটি পণ্য বিক্রি করা ছাড়া সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আর কোনো পদক্ষেপ নেই। হতাশার কথা শুনিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, 'মূল্যবূদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কিছুই করার নেই।' আরেক মন্ত্রী বলেছেন, 'মানুষের আয় বেড়েছে তিন গুণ, ফলে মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ওপর কোনো চাপই সৃষ্টি হচ্ছে না।' তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে ভিক্ষুক নেই। কষ্টে থাকা মানুষ মন্ত্রীদের এমন মন্তব্যে আরও বেশি ব্যথিত।
প্রতিবারই রমজানের আগে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। সংযমের মাসে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লাভে কোনো সংযম প্রদর্শন করেন না। আমরা জানি, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে সংযমের মাস রমজানে জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায়। আমাদের দেশে ঘটে উল্টো। ধর্মীয় মূল্যবোধ যেন মুনাফা লাভের নেশার কাছে হেরে যায়।
নব্বই দশকের শুরুতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করার প্রবণতা ছিল। বাজার অর্থনীতিই বিশ্বের শেষ কথা- এমন ধারণা সে সময় থেকে প্রবল হতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান বাজার অর্থনীতির ধারণাকে প্রবল করে তোলে। সমাজতান্ত্রিক চীনও এই ধারণা খানিকটা গ্রহণ করে। চীন প্রবর্তন করে নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি। বাজার অর্থনীতিতে যে কোনো পণ্য বাজারে সরবরাহ, চাহিদা ও গুণাগুণ অনুযায়ী পণ্যের মূল্য ক্রেতা-বিক্রেতাই নির্ধারণ করেন। অনেকেই বলেন, বাজার অর্থনীতিতে ক্রেতা-বিক্রেতা দু'পক্ষই স্বাধীন। বাজার অর্থনীতির সমর্থকরা একে মুক্তবাজার অর্থনীতি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। বাংলাদেশে বাজার অর্থনীতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি তিন ধরনের পক্ষ সৃষ্টি হয়েছে। এই পক্ষগুলোর সঙ্গে আবার কিছু উপপক্ষও আছে। বাজার অর্থনীতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরবরাহ গুণাগুণ চাহিদা একই থাকলেও উৎপাদনকারী ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষিত হয় না; বরং তৈরি হয় মুনাফা সৃষ্টিকারী একটি পক্ষের, যে পক্ষ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পণ্যটি ক্রয় করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও বলছে, দুই দশকে বাংলাদেশ ধান, মিঠাপানির মাছ, সবজি উৎপাদনে পৃথিবীতে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ফল উৎপাদনে দশম। ৫০ বছর আগে এক একর জমিতে যে পরিমাণ ধান উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন হয় তার তিন গুণ। প্রশ্ন হচ্ছে, পণ্যের উৎপাদন বাড়লেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান নয় কেন। কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না- এ অভিযোগ নতুন নয়। ক্রেতা এবং উৎপাদনকারী উভয় পক্ষের মধ্যে বাজার ব্যবস্থায় পক্ষ, উপপক্ষ আছে; যারা উৎপাদনকারীর কাছ থেকে কম মূল্যে পণ্য কিনে ক্রেতার কাছে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করছে। বাজারে পাইকারি বা খুচরা দু'পক্ষের একটা কারসাজি থাকে। সিন্ডিকেট শব্দটি দেশে বহুল প্রচলিত। এই সিন্ডিকেটের বৃহৎ অংশই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়। এরা মধ্যস্বত্বভোগী। মুনাফার লোভই তাদের ঐক্যবদ্ধ করে। এই ঐক্যে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব নেই। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে, কার্যত যে টাকা জনগণেরই। জনগণের টাকা নিয়ে জনগণের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করে মুনাফা সৃষ্টি করে উচ্চ মূল্যে জনগণের কাছেই বিক্রি করে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা।
সমাজতন্ত্রমুখী অর্থনীতিতে রাষ্ট্র দ্বারা বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাতে জনগণের স্বাধীনতা থাকে না। উৎপাদনকারী পক্ষের ভেতর প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয় না। ফলে সমাজে বৈষম্য কমলেও সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে- এ ধারণাই দিয়েছেন বাজার অর্থনীতির সমর্থকরা। কিন্তু বাজার অর্থনীতি যে কার্যত উৎপাদনকারী এবং পণ্যের ব্যবহারকারী উভয় পক্ষকে ঠকায়, সেটি তো প্রমাণিত সত্য। বাজার অর্থনীতিতে পণ্য থাকে, সঙ্গে থাকে বিক্রেতার প্ররোচনা, ক্রেতার স্বাধীনতা থাকে; কিন্তু কখনও কখনও ক্রেতার সাধ্য থাকে না। মুক্তবাজার এমন এক কৌশলী অর্থনীতি, যার কাছে সব ব্যবস্থা পরাধীন হয়ে যায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা যেসব দেশ, সেই ইউরোপ-আমেরিকা এই ব্যবস্থা তাদের দেশে বাস্তবায়ন করে না। তাদের দেশে 'প্রডাকশন, ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই চ্যানেল' কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাষ্ট্রগুলোর টাকার মানের তুলনায় প্রান্তিক রাষ্ট্রের টাকার মান কম।
বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব তো এখানেই শেষ। এর সঙ্গে আছে করের নানা বিধি-বাধ্যকতা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আমাদের দেশে পণ্য বিক্রিতে ট্যাক্স গোনে। আর আমরা ভারতে পণ্য পাঠাতে পারি না। কারণ ট্যাক্স গুনতে হয় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের দু'পর্যায়ে। আশার কথা, সপ্তাহ না ঘুরতেই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, সরকার কঠোর হবে। মন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরকারকে কঠোর হতেই হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মাথাপিছু আয় বাড়ে, কিন্তু দারিদ্র্য কমে না; যেখানে গরিব মানুষ বাজার ঘুরে শূন্য হাতে বাড়ি ফেরে। তাই বাজার অর্থনীতি নয়, নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি সৃষ্টির জন্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই হবে।
রুস্তম আলী খোকন: কলাম লেখক, সাবেক ছাত্রনেতা
- বিষয় :
- বাজার
- রুস্তম আলী খোকন
- মুক্তবাজার অর্থনীতি