ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

'অপাঙ্‌ক্তেয়' নারীর সুরক্ষা ও অধিকার

'অপাঙ্‌ক্তেয়' নারীর সুরক্ষা ও অধিকার
×

ফারজানা মাহমুদ

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২২ | ১২:০০

প্রতিটি সমাজেই যৌনকর্মীরা নিগৃহীত। আর আমাদের সমাজে তারা এতটাই ঘৃণিত যে, সাধারণ হোক কিংবা অনন্য নারীকে অপদস্থ করতে হলে অনায়াসে তাকে 'বেশ্যা' বা 'পতিতা' আখ্যায়িত করা হয়। যৌনকর্মীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। অথচ মানুষ হিসেবে তাদের নূ্যনতম সম্মান জোটে না। আর মারা গেলে জোটে না কবর কিংবা শেষকৃত্যের সম্মান। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রতারণা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন, পারিবারিক বিপর্যয়, মানব পাচার কিংবা চাকরির লোভে পড়ে অনেক নারী পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। অনেকের মতে, পতিতাবৃত্তি মানুষের মর্যাদার ওপর আক্রমণ, নারীর ওপর যৌন শোষণ এবং এই পেশা মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটায়। আবার অনেকে মনে করেন, যখন প্রাপ্তবয়স্ক নারী স্বেচ্ছায় যৌন পরিষেবা বিক্রি করেন, তখন এটা বৈধ পেশা এবং এতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না।
বাংলাদেশে ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব কোনো নারী যৌনকর্মী হিসেবে বৈধতা পেতে পারেন, যদি তিনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হলফনামায় স্বাক্ষর করে অনুমতিপত্র নেন। তবে উল্লেখ থাকে যে, হলফনামায় তাকে অবশ্যই ঘোষণা দিতে হবে- অন্য কোনো পেশা খুঁজে পেতে তিনি সমর্থ নন এবং তার ভরণপোষণের কোনো অবলম্বন নেই কিংবা তার সাহায্য করার কেউ না থাকায় তিনি স্বেচ্ছায় এই জীবিকা বেছে নিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে টানবাজার ও নিমতলী যৌনপল্লি উচ্ছেদের প্রচেষ্টা চালানো হলে প্রায় ১০০ যৌনকর্মী বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সহায়তায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। ২০০০ সালে এই মামলার রায়ে আদালত বলেন, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো নারী যদি প্রমাণ করতে পারেন- যৌন ব্যবসাই তার আয়ের একমাত্র উৎস, তবে তিনি এই পেশায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। আদালত আরও বলেন, জীবন ও জীবিকার স্বাধীনতা ও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য; যৌনকর্মীরাও তার বাইরে নন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর যেসব নারী দারিদ্র্য, প্রতারণা, জবরদস্তি, অসহায় কিংবা অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থার শিকার হয়ে অর্থ বা অন্য কোনো উপঢৌকনের বিনিময়ে যৌন কর্মকাণ্ডে বা নৈতিকতা পরিপন্থি পেশায় নিয়োজিত হয়, তাদের সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়ে হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব সামাজিক প্রতিবন্ধী নারীকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও আছে। সংবিধানের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র গণিকাবৃত্তি নিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি এবং পতিতালয় স্থাপন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৩৩ এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুসারে যৌনপল্লি পরিচালনা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও পেশাদার যৌনকর্ম কোনো আইনেই নিষিদ্ধ নয় (রাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, ২০০০)। আমাদের দেশে পতিতাবৃত্তি একটি নিয়ন্ত্রিত পেশা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে একে নিরুৎসাহিত করা হয়।


দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭২ ধারা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে বিক্রি করাকে বা ভাড়া দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। আবার ৩৭৩ ধারা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বেশ্যাবৃত্তির উদ্দেশ্যে ক্রয় করা, ভাড়া নেওয়াকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানা আরোপ করে। আবার মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২-এর ১১ ধারা মতে, পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনোভাবে যৌন শোষণ বা নিপীড়নের জন্য কাউকে বিদেশ থেকে বা বাংলাদেশের ভেতর স্থানান্তরিত করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। আবার একই আইনের ১২ ধারায় পতিতালয় পরিচালনা বা কোনো স্থানকে পতিতালয় হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। সক্রিয়ভাবে পতিতালয় স্থাপন বা পরিচালনায় শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা। মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো স্থানে পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাউকে ইশারা বা ভাষায় আহ্বান জানায়, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৩৩-এ যৌনপল্লি বা পতিতালয় পরিচালনা এবং পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে নারী ও শিশু পাচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে। এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ যৌনপল্লি পরিচালনা করে বা পরিচালনায় সাহায্য করে বা কোনো স্থানের দায়িত্বে থাকা কেউ জেনেশুনে কোনো জায়গা পতিতাবৃত্তির কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেয় বা ভাড়া দেয় তবে তাকে সশ্রম বা বিনাশ্রমে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আবার অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আবার ধারা ৭ অনুযায়ী পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে প্ররোচনাকারীকে বা পতিতার প্রতি আসক্তির জন্য উৎপীড়নকারীকে ১ মাস পর্যন্ত যে কোনো ধরনের কারাদণ্ড বা ১০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ১৯৩৩ সালের আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, ১৮ বছর বয়সের বড় কেউ যদি অন্য কারও পতিতাবৃত্তির আয়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে, তবে সেই ব্যক্তিকে সশ্রম বা বিনাশ্রম ৩ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আবার সেই অপরাধী পুরুষ হলে তাকে বেত্রদণ্ডও দেওয়া যাবে।
অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ ধারা পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাজে লাগানোর জন্য কোনো নারীকে প্রলুব্ধ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে। আবার ১০ ধারায় যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে যৌনকর্মী হিসেবে ভাড়ায় আয় করার জন্য আনে বা আনার চেষ্টা করে, তবে সেই ব্যক্তি আইনের চোখে অপরাধী। ৯ বা ১০ ধারার অধীনে কৃত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছর যে কোনো প্রকারের কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। অপরাধী পুরুষ হলে তাকে বেত্রাঘাতও করা হবে। আবার ১১ ধারায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কোনো স্থানে আটকে রাখাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এরূপ অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। ধারা ১২ অনুসারে যদি কোনো ব্যক্তি তার তত্ত্বাবধানে থাকা ১৮ বছরের কম বয়স্ক কোনো মেয়েকে পতিতাবৃত্তিতে উৎসাহিত করে বা ব্যবস্থা করে, তবে তাকে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। উপরন্তু পুরুষ অপরাধীকে বেত্রাঘাতও দেওয়া যাবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬-এ পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে কাউকে প্ররোচিত করা বা শোষণ করাকে উপদ্রব হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যমান পতিতাবৃত্তি-সংক্রান্ত আইনগুলো লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়। প্রচলিত কোনো আইনেই পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যাপারে কোনো কথা বলা হয়নি। নারীরা পতিতা বা যৌনকর্মী হয় বা তাদের পতিতা বানানো যায়। পুরুষ কি পতিতা হয়? আইন অনুযায়ী যৌনকর্মীদের কর্মক্ষেত্র যেহেতু অবৈধ; এই পেশায় নিয়োজিত নারীরা নানা হয়রানি, শোষণ ও সহিংসতার শিকার হন। যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত বহুলাংশে উপেক্ষিত। এইচআইভি-এইডস সংক্রমণে যৌনকর্মীরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। এ ঝুঁকি এড়াতে ভাসমান, তালিকাবহির্ভূত বা তালিকাভুক্ত সব যৌনকর্মীকে সচেতন করা প্রয়োজন। বিকৃত যৌনাচার, জোরপূর্বক যৌন শোষণ বা শারীরিক অত্যাচার যৌনকর্মীদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সাধারণ অবস্থায় এগুলো নারী নির্যাতন সম্পর্কিত আইনের আওতাভুক্ত, কিন্তু যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে যেন এসবের প্রশ্নই আসে না।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লিতে ৪ হাজারের মতো যৌনকর্মী আছেন। সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এসব যৌনকর্মীর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অন্যান্য নাগরিকের মতোই জীবনের অধিকার রয়েছে। রয়েছে আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সর্বোপরি টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যৌনকর্মীরা আমাদের সমাজেরই নিগৃহীত অংশ। মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা নিশ্চিতে রাষ্ট্রের যেমন দায় আছে, তেমনি আমাদেরও দায় আছে তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের।
ব্যারিস্টার ফারজানা মাহমুদ: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×