পোশাকশিল্পের স্বার্থে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান জরুরি
জাতীয় সম্পদ
ছবি-সংগৃহীত
আশিকুর রহমান তুহিন
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৩৭ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৯:১১
দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাকশিল্পের প্রধান জ্বালানি গ্যাস। সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, প্রাকৃতিক গ্যাস দেশের মোট বাণিজ্যিক জ্বালানির ৫৯ শতাংশ পূরণ করে। এ থেকে সহজেই অনুমেয় জ্বালানির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর আমরা কতটা নির্ভরশীল। তবে এই নির্ভরতার বিপরীতে শিল্পে চলছে গ্যাসের তীব্র সংকট। সম্প্রতি এ সংকট গুরুতর আকার ধারণ করেছে।
গ্যাসের অভাবে শিল্পঘন এলাকা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পোৎপাদন ভয়াবহভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা আপদের মধ্যে থাকা পোশাকশিল্পে গ্যাস সংকট যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বিদেশি ব্র্যান্ড ক্রেতাদের ফরমায়েশমতো পোশাক উৎপাদন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের হাতে পৌঁছানোর শঙ্কায় উদ্যোক্তাদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। ৮৫ শতাংশ রপ্তানি আয়ের জোগানদাতা তৈরি পোশাক খাত। অচিরেই সমস্যার সমাধান না হলে বিশেষত ডলার সংকটে ক্রমশ তলানিমুখী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও নাজুক অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য।
কে না অবগত যে, অতিমারি করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পতিত হয়। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এসবের প্রভাবে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এর জেরে ইউরোপ, আমেরিকার ধনী দেশগুলোতে খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানি ক্রয় করতে গিয়ে সেখানকার মানুষ পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পোশাকের চাহিদা কমেছে। এরই প্রভাবে আমাদের প্রধান বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাক রপ্তানি কমে আসছে। অন্যদিকে দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বাড়ায় তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে পোশাকশিল্পের সামনে। অর্থাৎ পোশাকশিল্প এখন চতুর্মুখী সংকটে।
এদিকে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি পোশাকশিল্পের সমস্যা আরও প্রকট করে তুলছে। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ও সিএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। তাতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। অধিকন্তু লিড টাইম বা স্বল্প সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ পোশাকশিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ডিসকাউন্টসহ অর্ডার বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কখনও আকাশপথে ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে হয়। এতে ব্যয় বাড়ে কয়েক গুণ। অর্থাৎ লোকসান দিয়েই চুক্তিমতো পণ্য পৌঁছাতে হয় তখন।
অন্যদিকে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজের ওপর একের পর এক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক শিপিংলাইনগুলো এই পথ এড়িয়ে ভিন্ন পথে জাহাজ চালাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় ও সময় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রপথের এ অপ্রত্যাশিত সংকটের মধ্যে গ্যাস সংকটের দরুন উৎপাদন সময় দীর্ঘায়িত হলে কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সুতরাং গ্যাস সংকটের তাড়াতাড়ি সমাধান আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে পোশাকশিল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে অগ্রগতি সাধন করছে। পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে বর্তমানে শীর্ষস্থানে রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০৬টি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) কর্তৃক লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৭৬টি কারখানা প্লাটিনাম রেটেড। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিজিএমইএ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস হতে ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে বয়লারসহ পোশাক শিল্পের ভারী যন্ত্রাংশসমূহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
গ্যাসের সমস্যা মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। প্রথমত, যেসব খাত জাতীয় অর্থনীতিতে অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রাখতে পারবে, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সেসব খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। পাশাপাশি সরকারকে পর্যাপ্ত পরিমাণে এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব অবৈধ গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন করতে হবে। পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের প্রণীত নীতিমালা এবং পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমৃদ্ধ ও আরও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে শিল্প খাতের ভূমিকা অপরিসীম। এই শিল্প খাতের বিকাশ ও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে জ্বালানি একটি অপরিহার্য বিষয়। কাজেই বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা
অব্যাহত রাখতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
- বিষয় :
- পোশাক খাত
- গ্যাস সংকট