আন্তর্জাতিক
রায় হওয়ার আগেই ট্রাম্প জেলে যাবেন?
রবার্ট রাইক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের নির্বাচনী ফল পাল্টানোর চেষ্টার অভিযোগে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বৃহস্পতিবার আদালতে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিচারক মক্সিলা এ উপাধ্যয়া সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প যদি জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেন বা বিচারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন কিংবা সম্ভাব্য সাক্ষীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন তবে তাঁকে জেলে যেতে হতে পারে। রেওয়াজমতো ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প’ না বলে ‘মিস্টার ট্রাম্প’ সম্বোধন করে বিচারক যে বিষয়ে জোর দিতে চেয়েছেন, সেটা হলো, তাঁকে আর দশজন অভিযুক্তের মতোই বিবেচনা করা হবে।
বিচারক এর পর ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ‘আপনি আপাতত মুক্ত থাকার শর্তগুলো শুনলেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেগুলো মেনে চলা। আপনি যদি মুক্ত থাকার শর্ত লঙ্ঘন করেন তবে বিচারের মাঝেই আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ এর পর তিনি ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যে বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে এবং সতর্ক না থাকলে পরিণতি কী হবে তা কি আপনি বুঝেছেন? আপনি কি সেগুলো মেনে চলতে প্রস্তুত’? ট্রাম্প জবাব দেন: ‘হ্যাঁ’।
কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যে পোস্ট দেন, সেটি বিচারকদের প্রভাবিত করার মতো পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সাক্ষীর প্রতি প্রতিশোধপরায়ণতাও প্রকাশ পায়। তিনি লিখেছেন: ‘আপনি যদি আমার পেছনে লাগেন, তবে আমিও আপনাকে ধরতে আসছি।’
শুক্রবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের বিশেষ কাউন্সেল জ্যাক স্মিথের দপ্তরের আইনজীবীরা ট্রাম্পকে থামাতে কোর্টকে বিশেষ সুরক্ষা আদেশ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। আদালত যাতে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করে না দেন, যে তথ্যটি বিচারের জন্য আইনজীবীদের জানানো হবে। যেমন, সাক্ষীদের নাম আগেই প্রকাশ না করা। তারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এই সুরক্ষা ‘বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও সাক্ষী, বিচারক, অ্যাটর্নি বা সরকারি আইনজীবী এবং তাঁর বিচারের সঙ্গে যুক্তদের ব্যাপারে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে লিখেছেন।
সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা শনিবার আদালতে বলেন, এমন তথ্য প্রকাশ সাক্ষীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে তারা সাক্ষ্য দিতে অনুৎসাহিত হতে পারেন। আইনজীবীরা ট্রাম্পের হুমকিমূলক পোস্টের স্ক্রিনশটও আদালতে উপস্থাপন করেন।
ওদিকে সপ্তাহজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখেন। শনিবার তিনি পোস্ট করেন, ‘কী দারুণ, অবশেষে সেটিই ঘটল! রক্ত গরম মাইক পেন্স, যিনি কিনা ইন্ডিয়ানার গভর্নর হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত হতে যাচ্ছিলেন। এর পর আমি তাঁর পাশে দাঁড়াই এবং তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বানাই। এখন তিনি অন্ধকারের পথে গেলেন।’
ট্রাম্প ন্যায়বিচারে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা থেকেও বিরত থাকেননি। রোববার তিনি জ্যাক স্মিথকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্য এক বার্তায় তিনি স্মিথকে দোষারোপ করেন। তাঁর মতে, স্মিথ এই মামলাকে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যবর্তী সময়ে আনার জন্য অপেক্ষা করেছেন। অন্য এক পোস্টে তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, তিনি তানিয়া চুটকান ও অন্যান্য বিচারকের মাধ্যমে কখনোই ‘ন্যায্য বিচার’ পাবেন না।
ট্রাম্পের এসব বিবৃতি জামিনে থাকার শর্তাবলীর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এগুলো তাঁর সমর্থকদেরও উত্তেজিত করে তুলতে পারে। এর ফলে স্মিথ ও চুটকানের মতো যারা বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িত কিংবা পেন্সের মতো যারা সাক্ষী, তাদের জীবনও বিপন্ন করে তুলতে পারে।
অবস্থা আরও খারাপ হতো, যদি চুটকান উদ্যোগী না হতেন। কিংবা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তাগিদ না দিতেন। তিনি ট্রাম্পের আইনজীবীদের কারণ দর্শাতে বলেছেন– তাঁর জামিনের সিদ্ধান্ত কেন প্রত্যাহার করা হবে না। কারণ তিনি বারবার জামিনের শর্ত ভঙ্গ করছেন। এর মাধ্যমে অন্তত ট্রাম্পকে এ বিষয়টি জানানো হচ্ছে– তাঁর সঙ্গে অপরাধে অভিযুক্ত অন্য যে কারও মতোই আচরণ করা হবে, যে বিচারাধীন মামলার সময়ে মুক্ত থাকার শর্ত ভঙ্গ করে। এটাই আইনের শাসন।
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৪ লাখ অভিযুক্ত রয়েছে, যারা বিচার চলাকালে জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ যে কোনো অভিযুক্তের ক্ষেত্রেই এমনটি হওয়া উচিত। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি আদালতের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের পরীক্ষা করেই যাবেন।
আদালতকে অবশ্যই বিচার কাজের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলার ব্যাপারে দৃঢ় থাকতে হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে বিচার চলাকালেই তাঁকে কারাগারে রাখার ব্যাপারে সতর্ক করে যেতে হবে। আর তিনি যদি জামিনের শর্ত এভাবে লঙ্ঘন করতেই থাকেন, তবে তাঁকে কারাগারে পাঠানোই সমীচীন হবে।
রবার্ট রাইক: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শ্রমমন্ত্রী; ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ের অধ্যাপক; গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর
মাহফুজুর রহমান মানিক