শ্রদ্ধাঞ্জলি
দেশপ্রেম ও নিবেদনের অনুপম উদাহরণ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
বাংলাদেশে সংবাদপত্রের জগতে যারা পুরোধা, যশস্বী, তাদের শ্রেষ্ঠতমদের সারিতে চিরদিনের জন্য সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের [১ এপ্রিল, ১৯৪৩-১৩ আগস্ট, ২০১৮] নামটি লিখিত হয়ে গেছে। কবে, কোথায় প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, সে কথা আজ আর মনে না থাকলেও, যা মনে আছে তা হলো– দেখা হওয়ার প্রথম দিনটিতেই সারওয়ার ভাই আমাকে কাছের করে নিয়েছিলেন, যেন আমাদের কতকালের জানাশোনা! সেদিন তাঁর ব্যক্তিত্ব আমার ভেতর গাঢ় রেখাপাত করেছিল এবং আজও অনুভব করি, মৃত্যুর পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি আমার হৃদয়ে একই রকম জীবন্ত, প্রাণবান।
সম্ভবত ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক তিনি, যখন তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা। সেই শুরু। এরপর যতবার দেখা হয়েছে, রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য নিয়ে ছোট-বড় আলাপ হয়েছে, তাঁর কথা ঋদ্ধ করেছে আমাকে। বিভিন্ন সময়ে অনেক অপ্রিয় প্রসঙ্গও সেসব আলাপে উঠে এসেছিল এবং দ্বিমত হয়েছি তাঁর সঙ্গে, ব্যক্তও করেছি। তবু কখনও আমার প্রতি তাঁর স্মিত, সস্নেহ হাসিটি ম্লান হতে দেখেনি। তাঁর ভেতর আরেকটি বিষয় দেখেছি, যে প্রসঙ্গে বলতে হলে এশিয়ায় সাংবাদিকতার দিকপালদের অন্যতম, বাংলাদেশে ইংরেজি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ সৈয়দ মোহাম্মদ আলীর একটি কথা আমার মনে পড়ে। এসএম আলী আমাকে বলেছিলেন, একজন সাংবাদিকের অনেক গুণ থাকতে হয়। তার একটি ধৈর্য, অন্যটি স্থিরচিত্ততা। হয়তো মনের ভেতর কোনো ঘটনা বা বিষয় নিয়ে তোলপাড় চলছে। কিন্তু মুখ দেখে যেন বোঝা না যায়– তিনি এসবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন। সারওয়ার ভাইয়ের মাঝে এসএম আলীর বলা এ দুটি গুণ আমি পূর্ণরূপে বিকশিত দেখেছি। সীমাহীন ধৈর্য আর স্থিরচিত্ততায় গোলাম সারওয়ার ছিলেন একজন আদর্শ সাংবাদিক এবং পরিপূর্ণ মানুষ।
এমন ব্যক্তিত্বের মানুষের প্রতি অযুত মানুষ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন এবং তাঁর ক্ষেত্রেও এটিই হয়েছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ও সক্ষমতায় ছোট পরিসরের সংবাদপত্র শিল্প ক্রমে বড় পুঁজির আওতায় এসে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রূপ পায়। সংবাদ, পূর্বাণী, ইত্তেফাকের কর্মচঞ্চল সৃজনশীল তরুণ সাংবাদিক শ্রমে, সংগ্রামে, অভিজ্ঞতায় কালক্রমে হয়ে ওঠেন যুগান্তর ও সমকালের মতো বাংলাদেশের দুটি প্রথম সারির দৈনিকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সাংবাদিকদের দায়িত্ব সম্পর্কে গোলাম সারওয়ার যেমন সচেতন, তাদের অধিকার নিয়েও তেমনি ছিলেন সক্রিয়। স্বচ্ছতা ও সুচারুতার সঙ্গে সংবাদপত্র পরিচালনাই শুধু নয়, সংবাদকর্মীদের প্রাপ্য ন্যায্য বেতন ভাতা, সুবিধাদি নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠায় যে অবদান তিনি রেখেছেন, তা আমি অনন্য মনে করি। বাংলাদেশের নানা শহর-বন্দরে ছড়িয়ে থাকা সাংবাদিক, যারা কোনো কারণে ‘মফস্বল সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচিত, তাদের প্রতি সস্নেহ সমানানুভূতি ছিল তাঁর। গ্রাম ও উপশহর পর্যায়ের সেই নিরলস, নিবেদিত সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষাতেও তাঁকে আমি সদাসচেষ্ট দেখেছি। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রধান অভিভাবকও ছিলেন তিনি।
সারওয়ার ভাই বিষয়ে একটি মানবিক আচরণিক প্রসঙ্গ উল্লেখ্য। আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা, কটু কথা, মানুষকে ছোট করার একটা চর্চা ক্রমবর্ধমান। কারও সৎ আগ্রহকে সম্মান জানানো যেন পুরোনো দিনের একটি রীতি, বর্তমান সময়ে অচল। গোলাম সারওয়ার তাঁর জায়গা থেকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন। তিনি শিখিয়ে গেছেন, মানুষকে কীভাবে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে হয়। অগ্রজ হলেও যেমন, অনুজ হলেও তেমনই। সংবাদপত্রকেন্দ্রিক সৃজনশীল যে কারও সৎ উদ্যোগে তাঁর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা উপস্থিত থাকত।
সত্তর-আশির দশকে অনেক সাংবাদিক কর্মরত ছিলেন, যাদের একনামে দেশের মানুষ চিনত। তারাই আমাদের সাংবাদিকতার জগৎটাকে পরিব্যাপ্ত করেছেন; নীতি ও আদর্শের বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাংবাদিকতা বিষয়টা যে আর দশটা বিষয়ের মতো নয়; এটি যে একই সঙ্গে সত্য উদ্ঘাটন ও প্রকাশ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার একটা ঘোষণা, তা অনেকেই মনে রাখেন না। গোলাম সারওয়ার এটি মাথায় রেখেই চলতেন। তাঁর নীতিত্রয়ী: একাত্তরের উদ্দীপনা-চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও অগ্রসর চিন্তা, জীবনের শেষাবধি অক্ষুণ্ন ছিল। তাঁর সার্বিক কর্মযজ্ঞ শুধু ব্যক্তি তাঁকেই নয়, তাঁর সম্পাদিত সংবাদপত্রকেও বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভরযোগ্যতায় গণমানুষের কাছে বিশেষ করে তুলেছিল।
রাষ্ট্র তাঁকে সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য একুশে পদক দিয়ে সম্মান দেখিয়েছে। আরও অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। স্বীকৃতিগুলো তিনি গ্রহণ করেছেন বিনয়ের সঙ্গে এবং নিজের কাজে একনিষ্ঠ থেকেছেন।
গোলাম সারওয়ারের কিছু প্রবন্ধের বই নানা সময়ে আমি সংগ্রহ করেছিলাম। কিছু প্রবন্ধ তিনি লিখেছিলেন সম্পাদকের অবস্থান থেকে– ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’। আবার কিছু লিখেছিলেন নিজের জবানিতে– ‘আমার যত কথা’। তাঁর লেখা আমার প্রিয় একটি বই ‘স্বপ্ন বেঁচে থাকে’। তিনি ছড়াও লিখেছেন, শিশু একাডেমি থেকে ‘রঙিন বেলুন’ নামে একটি ছড়া গ্রন্থও বেরিয়েছিল তাঁর। তবে একটি বিষয় আমার আক্ষেপ হয়ে জেগে আছে, তা হলো– প্রতিভা-শক্তি-সাধ্য এই সমস্ত সত্ত্বেও সাংবাদিকতার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সাহিত্যকর্ম তাঁর তেমন হয়ে ওঠেনি।
কখনও কখনও সমকালের প্রথম পাতা অথবা উপসম্পাদকীয় পাতায় রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে লিখেছেন; লিখেছেন সাংবাদিকতার নীতিনিষ্ঠতা, বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে; যেসব লেখার পরিধি মূলত পেশাদারিত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিস্তৃত ছিল। এবং শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার কলম তুলে রেখে মননশীল ও সৃজনশীল লেখকের কলম– আমি মন থেকে যেমন চেয়েছিলাম তেমন করে– তুলে নিতে তাঁকে দেখিনি। তবে যে ব্যাপারটি আমার মনে আশা জাগিয়ে রেখেছে তা হলো, আমি দেখেছি, গোলাম সারওয়ার যে অভিজ্ঞতা সারাজীবনে সঞ্চয় করেছেন, তা নতুন দিনের তরুণ লেখক-সাংবাদিকরা সাদরে গ্রহণ করেছেন। তাঁর প্রবাদপ্রতিম সক্রিয়তা আজ অসংখ্য সাংবাদিককে এতখানি অনুপ্রাণিত রাখে যে, সেই অনুপ্রাণিত মানুষগুলোও সংবাদজগতের দায়িত্বপূর্ণ পদে স্মরণীয় রাখার মতো কর্মে নিজেদের ব্রতী রাখেন। অসহায় মানুষের আশ্রয় সংবাদপত্র– এ কথা কেবল বিশ্বাসই করতেন না গোলাম সারওয়ার, নিজের কাজে তাঁর প্রতিনিয়ত ছাপ রাখতেন। এ দেশের সংবাদপত্র গোলাম সারওয়ারের বিশ্বাসকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে– আমাদের এই প্রত্যাশা।
ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবসে সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, আমাদের সকলের প্রিয় সারওয়ার ভাইয়ের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে আলোকবর্ষ এগিয়ে নিয়ে দেশপ্রেম ও নিবেদনের যে নিদর্শন তিনি রেখে গেছেন, অগ্রসর দেশের যে স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, প্রত্যেকের হৃদয়ে তা প্রাণদায়িনী আগুন হয়ে জেগে থাকুক।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : কথাশিল্পী, শিক্ষাবিদ
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম