রাজনীতি
নির্বাচনে ফেরেশতা মোতায়েন ও পুলিশের অগ্রিম ভোট প্রার্থনা
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ০৬:০৯
আমাদের দেশের রাজনীতিতে ধর্ম কিংবা ধর্মানুভূতির ব্যবহার খুব যে সাম্প্রতিক বিষয়, এমন কিন্তু নয়। পাকিস্তানি শাসক এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ধর্মকে ব্যবহার করেছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন তথা প্রগতির স্রোতকে থামিয়ে দিতে। ১৯৭১-এ ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর আশা করা হয়েছিল, এবার হয়তো রাজনীতিটা অন্য রকম হবে। রাজনীতিকে মূল্যায়ন করা হবে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পরপরই পুরোনো ধ্যান-ধারণা জেঁকে বসতে শুরু করে। জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয় উল্টোরথের যাত্রা। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এতে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা।
নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসানের পর আরও একবার আশা করা হয়েছিল, ধীরে ধীরে হয়তো অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু গত তিন দশকের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার কালেও রাজনীতিতে ধর্মের খেলা এবং ব্যবহার তো কমেইনি, বরং নতুন উদ্যমে তা বেড়ে চলেছে। যোগ হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা।
নব্বই-পূর্ব ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একচেটিয়া ব্যবহারকারী ছিল জামায়াতে ইসলামীর মতো সরাসরি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা দলগুলো। তারা তা করত কোনো রাখঢাক ছাড়াই। কিন্তু নব্বইয়ের পর ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী বিএনপির মতো দলও এতে যোগ দেয়। বিশেষ করে নির্বাচন এলেই ধর্মকে এরা সামনে নিয়ে আসে। প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে– কে কার চেয়ে বেশি ধর্মপ্রেমী। তারা জানে, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, তবে তারা ধর্মপ্রাণ। সাধারণ মানুষের এই আবেগকে পুঁজি করে নির্বাচন এলেই ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।
৩০ বছর ধরে নির্বাচন এলেই প্রবল হয়ে ওঠে এদের ধর্মীয় জোশ। শুরু হয় ধর্ম নিয়ে নির্বাচনী বচনামৃত বর্ষণ আর বাগাড়ম্বর। তবে এবার রাজপথের প্রধান বিরোধী দলগুলো যেহেতু নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও দ্বিধায় রয়েছে; চলছে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও পর্দার আড়ালে বড় বড় দেশের দূতিয়ালি; তখন সরকারি দলই ধর্ম নিয়ে প্রথম চাল চালতে শুরু করে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, অপশাসন, সরকারি সম্পদ লুটপাট, লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার– এসব কারণে মানুষ ক্ষমতাসীন দল থেকে ক্রমে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তখনই দলটির কর্তাব্যক্তিরা প্রচারে নেমে গেছেন। তাদের হাতে ধর্ম; বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম কতটুকু নিরাপদ তা প্রমাণের বিষয়। ভোটের রাজনীতিতে এটা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্বাভাবিক ঠেকে তখনই যখন দেখা যায়, প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসকেও বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচনে ‘আল্লাহ শেখ হাসিনার জন্য ফেরেশতা পাঠাবেন। এটা যদি কেউ মনে না করেন, ইমান চলে যাবে। ফেরেশতা দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেবেন।’ (মানবজমিন অনলাইন, ২০ জুলাই, ২০২৩)। গত ১৮ জুলাই জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত ‘শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা’ কর্মসূচিতে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ যে স্পষ্টতই ধর্মানুভূতির বিকৃত ও অপপ্রয়োগ– তাতে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই।

এ কথা সবাই জানে, বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় স্বাভাবিক অবস্থায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ক্ষেত্র ও অবস্থা বিবেচনায় বিজিবি, র্যাব, এমনকি সেনা মোতায়েনও করা হয়। কিন্তু আকাশ থেকে ‘ফেরেশতা মোতায়েন’-এর কথা কেউ কখনও বলেছেন, এমনটা শোনা যায়নি। আমি বিশ্বাস করি, এই বক্তৃতা যদি অন্য কোনো দলের কোনো নেতা করতেন, তাঁর বিরুদ্ধে সারাদেশে মামলার হিড়িক পড়ে যেত। এ ক্ষেত্রে তা হবে না। কারণ বক্তা সরকারি দলের একজন নেতা।
আসলে ইমান নিয়ে এ ধরনের ব্যবসা এ দেশে নতুন কিছু নয়। গত শতাব্দীতে যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখনই তার জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্রের যে তিনটি মূলনীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার প্রথমটিই ছিল এই ‘ইমান’ (ইমান, একতা, শৃঙ্খলা)। তারপর ২৪ বছর ইমানের দোহাই দিয়েই এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এক সময় তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সেই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসে। সেই আওয়ামী লীগই আজ স্বাধীনতার ৫২ বছর পর ইমানি জজবা নিয়ে মাঠে নেমেছে ভোটের রাজনীতিতে। যদিও আলোচ্য বক্তব্যটি জেলা পর্যায়ের একজন নেতার মুখনিঃসৃত, কিন্তু পত্রপত্রিকায় ফলাওভাবে প্রচারিত হওয়ার পরও যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে এর প্রতিবাদ করা হয়নি; ধরেই নেওয়া যায়, কেন্দ্রের এতে সায় রয়েছে। তাই একে দলীয় বাণী হিসেবে ধরে নিলে খুব একটা ভুল হবে না।
এদিকে গত কিছুদিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ ক’জন পুলিশ কর্মকর্তা আগামী নির্বাচনে সরকারি দলকে ভোট প্রদানের জন্য আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। গত ১৫ আগস্ট কুমিল্লায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৮তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের জন্য ভোট চেয়েছেন নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ। একই দিনে আওয়ামী লীগকে নিজের দল দাবি করে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট চেয়েছেন দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ওসি শ্যামল চন্দ্র ধর। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। জবাবে তিনি বলেছেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে এ বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানে ওসি শ্যামল চন্দ্র সমবেত উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে আরও বলেন, ‘কুচক্রী মহল থেকে আপনারা সাবধান থাকবেন এবং সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী নির্বাচনে যেন আমরা পুনরায় আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করতে পারি।’
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাই যদি এভাবে নির্বাচনের চার মাস আগে থেকে প্রকাশ্যে কোনো বিশেষ দলের জন্য ভোট প্রার্থনায় লিপ্ত হন, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়– বিরোধী দলের এই দাবি প্রমাণে আর কোনো যুক্তির দরকার পড়ে না। সেই সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ইমান-আকিদার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। তবে নির্বাচনে আসমানি ফেরেশতার আর দরকার নেই; যেমনটি ছিল না ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর নির্বাচনে। অবশ্য কক্সবাজারের মুজিবুর রহমান যদি মর্ত্যের সরকারি ফেরেশতাদেরই বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তো কিছুই বলার থাকে না। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, স্বাধীনতার ৫২ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দলটির ঘাড়ে মুসলিম লীগের ভূত চেপে বসেছে। এই ইমানি দায়িত্ব পালনের দায়ভার ন্যস্ত করা হচ্ছে মর্ত্যের ফেরেশতারূপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর। তবে এ কথা কে না জানে, ইমান নিয়ে ধর্মচর্চা হয়; রাজনীতির খেলায় ইমানের বহুল ও অযাচিত ব্যবহার দেশ এবং রাজনৈতিক দল কারও জন্যই ক্ষতি বৈ মঙ্গল বয়ে আনে না। পাকিস্তানের মুসলিম লীগ তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কি সে পথেই হাঁটছে?
মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- রাজনীতি
- মোশতাক আহমেদ