রাজনীতি
‘নিরপরাধ’ আওয়ামী কর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার পথ
ড. মাহবুব হাসান
মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:১২ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫১
আওয়ামী লীগ টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থেকে যে ভীতির সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছিল, সেটা থেকে জনসাধারণ এখনও বের হতে পারছে না। নেতারা যা-ই বলুন; দলটির সাধারণ কর্মীরাও তাদের দেড় দশকের কর্মকাণ্ড নিয়ে যেন রাজনৈতিক সমাজে মুখ দেখাতে পারছে না। যদিও তাদের মনে ও আচরণে কোনো রকম অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
স্বীকার করতে হবে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলেও দেশে রয়ে গেছে দলটির বিশাল কর্মী বাহিনী। তাদের অধিকাংশই নিরপরাধ; নেতৃস্থানীয়দের মতো দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস, হত্যায় জড়িত ছিল না। কিন্তু এই বিশাল কর্মী বাহিনীও দিশেহারা ও নৈতিকভাবে পরাজিত। শেখ হাসিনা কেবল নিজেকেই জনবিচ্ছিন্ন করেননি; আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল গণমনস্ক দলকেও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ঠেলে দিয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুতির পরও এই চরম বাস্তবতা তিনি ও তাঁর নেতারা সম্ভবত বুঝতে পারছেন না। তারা পুরোনো কায়দায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন; হাঁটছেন পরিত্যক্ত রাজনীতির সংকীর্ণ গলিপথ ধরে। আপাতত ওই গলিপথ দীর্ঘ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে পাল্টে গেছে– সেটা বোঝার মন ও মানসিকতা নেই আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতৃত্বের। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা আওয়ামী রাজনীতির বটিকা সেবন করে অন্ধ হয়েছেন, তারাও রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তন উপলব্ধি করতে পারছেন না। তারা বিধিবদ্ধ চেতনার বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা কিছু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ আছেন, যারা ধান্দাবাজদের কারণে আগেই নেতৃত্ব থেকে ছাঁটাই হয়ে গেছেন। এখন তারাই বেশি ভুক্তভোগী। কিন্তু তারাও ভুল স্বীকার করতে পারছেন না। কারণ আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে, নেত্রী যা বলছেন সেটাই সঠিক পথ।
আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাসে যুক্ত ছিলেন না, তাদেরও সবকিছুর আগে ভুল স্বীকার করে নিতে হবে। বুঝতে হবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা গত দেড় দশকে উন্নয়নের নামে যা করেছেন তা মূলত লুটপাট। জনসাধারণ ভয়ে কিছু বলতে পারেনি; কিন্তু এসব ভালো চোখেও দেখেনি। আওয়ামী লীগের নিরপরাধ নেতাকর্মীরা রাজনৈতিকভাবে অন্ধ হয়ে পড়েছেন; রাজনীতির বিচার ও বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
রাজনীতি পরিবর্তনশীল একটি সাংস্কৃতিক ধারা। রাজনৈতিক কর্মীদের বুঝতে হয় কোথায়, কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। বিএনপি যখন ১৬ বছর ধরে রাজনীতির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নৌপথে গণতন্ত্রের জন্য সাঁতার কেটেছে, তখন ক্ষমতার মগডালে থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ওদের কোমরে জোর নেই। তাই তারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বের করত ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে বলেছে, বিএনপিকে দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে কোনটি আসল রাজনীতি।
বিএনপির জনমুখী রাজনীতির সুফল ২০২৩ সালেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তৃণমূল থেকে রাজধানী, তৎকালীন সরকার ও সরকারি দলের সব বাধা বিএনপির কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছিল লাখ লাখ জনতা। রাজনৈতিকভাবে তারা বিএনপির কর্মী হলেও সামাজিকভাবে ছিল উৎপাদক শ্রেণির প্রতিনিধি। তারা যেমন নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা চেয়েছে, তেমনই অহিংস রাজনীতির মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। যে কারণে ওই বিশাল জনস্রোত কোনো ধ্বংসাত্মক পথে যায়নি। তারা ভাঙচুর করেনি কোনো সরকারি বা বেসরকারি সম্পদ। আগুন দিয়ে যাত্রীসহ বাস পোড়ানোর কোনো ঘটনা তারা ঘটায়নি। এমনকি কেন্দ্রের বিশাল সমাবেশকে গোলাপবাগ মাঠে ঠেলে দেওয়া হলেও; জনস্রোত ঠেকাতে বাস-ট্রাক-ট্রেন বন্ধ করা হলেও; বিভিন্ন হোটেলে পুলিশের তল্লাশি চললেও মানুষ আতঙ্কিত হওয়ার বদলে অকুতোভয়ে হেঁটেই যোগ দিয়েছে জনসভায়। নয়াপল্টনের জনসভার ১০ লাখ মানুষ যদি গণভবনের দিকে অগ্রসর হতো, সেই জনসুনামি ঠেকানোর কোনো উপায় ছিল না। ২০২৩ সালের অক্টোবরের গণতান্ত্রিক সংকেত শেখ হাসিনা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই চূড়ান্ত পরিণাম ভোগ করেছেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
এখনও ধ্বংসাত্মক পথে না ফেরানো যাবে শেখ হাসিনাকে, না প্রতিষ্ঠা করা যাবে আওয়ামী লীগকে। আমাদের মনে আছে– মুসলিম লীগ কেমন করে অস্তিত্ব হারিয়েছে। আওয়ামী লীগ ওই একই পথ ধরেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি ইতিবাচক হতে হয়। জনকল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় আদর্শ কায়েম করতে হয়। আওয়ামী রাজনীতি সেই পরিবর্তনে আগ্রহী নয় বলেই যারা গত দেড় দশকে অন্যায় করেননি, তারাও আজ কার্যত আত্মগোপনে।
আওয়ামী লীগ এখনও যদি ইতিবাচক রাজনীতি করে, দলটি যদি দেড় দশকের অপরাধ ও ভুলের কথা স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে নিরপরাধ আওয়ামী নেতাকর্মীরা রাজনীতি করতে পারত। ভুল-ত্রুটির জন্য করজোড় ক্ষমা প্রার্থনাই নির্দোষ আওয়ামী লীগারদের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের একমাত্র পথ এখন।
কেউ যদি ভাবেন, শেখ হাসিনা মিথিক্যাল ফিনিক্স পাখির মতো আবারও পুনর্জন্ম নেবেন– সে আশা দুরাশামাত্র। রাজনীতিতে মিথের সত্য তখনই বাস্তব হয়ে উঠতে পারে যদি কোনো রাজনীতিক ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবর্তিত রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারেন।
নিরপরাধ আওয়ামী লীগারদের রাজনীতিতে ফেরার জন্য এখন দুটি শিক্ষা সামনে আছে। প্রথমত, বিএনপির রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রতিহিংসার বিপরীতে অহিংসা ও গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি। দ্বিতীয়ত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক দফায় উঠে আসার ক্ষেত্রে প্রাণ হারানোর পরও মানুষ বুক পেতে দিয়েছে কোন নৈতিক সাহসে?
ড. মাহবুব হাসান: কবি ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- আওয়ামী লীগ
- মাহবুব হাসান