রাজনীতি
আশার ছলনে আর যেন না ভুলি
মাহবুব হাসান
মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের দেশের রাজনীতিকরা সাধারণত আশা দিতে ভালোবাসেন, বাস্তবায়ন করতে নয়। আমরা ‘হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা’ বলে, বিশেষত নির্বাচনের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দেন, তার এক ভাগও ঠিক সময়ে ঠিকমতো পূরণ করতে পারেন না। জনগণও ‘আশায় বসতি’ করে। রাজনৈতিক নেতারা যখনই কোনো ওয়াদা দেন তখন তারা তাতেই বাহবা দেয়। একটি লোকপ্রবাদ আছে–‘যে দেশে যে ভাও/উব্দা করে নাও বাও’। এর মানে হচ্ছে যে দেশে জনপরিসরে যে রীতি চলে, সেই দেশও সেভাবেই চলে। উব্দা করে মানে হচ্ছে উল্টো করে নৌকা বাওয়া।
২.
রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে বহু বাহাস আছে, তর্ক আছে। যারা গণতন্ত্রপন্থি তারা এক রকম যুক্তি দেখান, আর যারা পোশাক-আশাকে গণতন্ত্রের চকমকি ধারণ করেন, তারা অনেকটাই ভেকধারী। আওয়ামী দুঃশাসনামলে একবার জনৈক আওয়ামী ব্যারিস্টারকে বলেছিলাম–শেখ হাসিনার সরকার কি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে? তিনি ক্ষেপে গেলেন, বললেন হাসিনার আমল পুরোটাই গণতান্ত্রিক। ওই ব্যারিস্টার বলেছিলেন, আয়নাঘর বলে কিছু নেই। গুম, খুন নিয়ে অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। মনে পড়ল শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, ‘ইলিয়াস আলীকে বিএনপিই লুকিয়ে রেখে আমাকে দোষারোপ করছে। দেখবেন তিনি ফিরে আসবেন।’ ইলিয়াস আলী আর কোনো দিনই ফেরেননি। সেই নির্মম ইতিহাস তো বেরিয়ে এসেছে এই অন্তর্বর্তী শাসনামলে।
আমাদের দেশে এ রকম রাজনীতিকের সংখ্যা নেহাত কম না। স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছি আমরা জীবন বরবাদ করে, কিছু ভারতপ্রেমী আছে, যারা মনে করে ওই দেশের সাহায্য ছাড়া আমরা জিততে পারতাম না। সত্য, সাহায্য তারা করেছে। প্রায় কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। স্বাধীনতাযোদ্ধাদের একটি অংশকে তারা সামরিক ট্রেনিং দিয়েছে। গোলাবারুদ আর অস্ত্র পেয়েছি আমরা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে, আজকে তারা রাশিয়া নামের দেশ। চোরাই পথে আসা কিছু চীনা অস্ত্র আমরা পেয়েছি। কিছু ব্রিটিশ এলএমজি আমরা নানা সোর্স থেকে পেয়েছি। সব মিলিয়ে তারা বহু সহযোগ দিয়েছে। গোটা দেশ আমরাই শত্রুমুক্ত করেছি নিজেদের মনোবলের ওপর ভর করে। শেষমেশ এসে দেখা গেল বিজয়ী হিসেবে দাবি করছে ভারতীয় বাহিনী। প্রথম দিকে তারা মুক্তিবাহিনীর কথা বলত। যৌথ বাহিনীর তৎপরতার কথাও শোনা গেছে তাদের সামরিক-বেসামরিক নেতাদের মুখে। তারপর তারা যে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয়ী হয়েছে, সেই সাফল্য সগৌরবে পালন করছে নিজেদের বিজয় বলে। ১৬ ডিসেম্বর তারা বিজয় উৎসব উদযাপন করে। এমনভাবে ইতিহাস চুরি করবে ভারত, এটা কেউ ভাবেনি।
আবার এ দেশে এমন লোকও আছে, যাদের ধারণা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হারিয়েছে ভারতীয় বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধারা নয়। এই রকম জ্ঞানপাপীরাই ছাগল দেখে এসে বলে হাতি দেখে এলাম। এরাই হলো আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী কালসাপ।
৩.
আমার বিদ্যা-বুদ্ধি কম, তাই অন্যের সমালোচনা করতে ভালোবাসি। নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি চোখে পড়ে না আমার। আমার পোশাক-আশাক যে দেশি নয়, এটাও জানি না। এটা মূলত আত্মপ্রবঞ্চনার লক্ষণ। এটা কী গাছ? ফল দেখে যায় চেনা। আমাদেরও চিনতে হলে পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, শিক্ষা-দীক্ষার অবস্থা, ভাষিক রূপ দেখে বলতে পারি আমরা অমুক। আমরা বাঙালি বা বাংলাভাষী মানুষ। তাতেও সংকট কাটে না। কিছু মানুষ আছেন, যারা বলবেন আমরা শুধুই বাঙালি। আসলে আমরা বাঙালি, একই সঙ্গে বাংলাদেশিও। আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, চেতনা রয়েছে। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে নিজেদের আত্মপরিচয়কে সংহত করার। সেটি অত্যন্ত জরুরি। তাহলে নিজের শিরদাঁড়া খাড়া করার শক্তি অর্জন সম্ভব।
গত ৫৪ বছরে মাত্র কয়েকবারই বাংলাদেশের প্রশাসনের মধ্যে আত্মপরিচয়ের শির খাড়া করার চেষ্টা দেখেছি আমরা। বিশেষ করে বাংলাদেশ-
ভারতের মধ্যকার সীমান্তবিরোধ নিয়ে, ভারতীয় বিএসএফের গুলি এবং তাদের দ্বারা হত্যার প্রতিবাদে। তবে সেসব প্রতিবাদ ছিল খুবই নরম সুরের প্রতিবাদ। কড়া প্রতিবাদ বলতে কিছু আছে–এটা আমরা যেন চিরদিনের মতো ভুলে গেছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই কেবল আমরা টের পেলাম যে আমাদের শিরদাঁড়া আছে এবং তা আত্মমর্যাদা আর জাতি হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে বলিষ্ঠ করে তোলার একটি লক্ষণ।
৪.
এই প্রথম বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মুখে অসাধারণ ভাষণ আমি শুনলাম। দেশের প্রায় সব সচেতন মানুষই তাঁর ভাষণের প্রশংসা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের একটি সহজ কিন্তু বিখ্যাত উক্তি–আই হ্যাভ এ ড্রিম–অনুসরণ করে বলেছেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। তারেক রহমান তাঁর প্ল্যানের খসড়া দেড় বছর আগেই আমাদের কাছে দিয়েছেন। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ২৭ দফা এবং তিনি নির্মাণ করেছেন ৩১ দফা। এই ভিশন তিনি নির্মাণ করেছেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার সারাংশ এসেছে শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়ার চেতনাপ্রবাহ থেকে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই ধ্যানই আমাদের পৌঁছে দেয় একটি লক্ষ্যে–‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’
তাঁর এই প্ল্যানের বাস্তবায়ন দেখতে চায় জাতি। অতীতে আমরা বহু প্ল্যান পেয়েছি, তার সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। আশার ছলনে আর ভুলতে চাই না আমরা। শহীদ জিয়া সময় পেলেন না তাঁর ভিশনারি প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে। তার আগেই তাঁকে হত্যা করা হলো। তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’ যেন কোনো আধিপত্যের হিংস্র থাবার আঘাতে ভন্ডুল না হয়, সেটিও আমরা চাই।
ড. মাহবুব হাসান: সাংবাদিক
- বিষয় :
- মাহবুব হাসান