পররাষ্ট্র নীতি
বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন বৈশ্বিক অবস্থান
খাজা মাঈন উদ্দিন
খাজা মাঈন উদ্দিন
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বশক্তিগুলো আজ নিজেদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যস্ত। এই পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সংকট স্পষ্ট। প্রতিবেশী অঞ্চলে ভারতের দাম্ভিক নীতির প্রভাবও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা বাড়ছে। এ বছর থেকে ঋণ পরিশোধের চাপও আরও ভারী হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ও বৈশ্বিক চাকরির সুযোগ ধরাও সহজ নয়। বিশ্বায়নের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানোর মতো বাংলাদেশের সক্ষমতাও সীমিত। ক্ষমতার দাবিদারদের জন্য এসব প্রশ্ন তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান নিয়ে ঘরে-বাইরে তেমন কোনো আলোচনা বা বিতর্ক চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান কী হবে–সে প্রশ্ন তেমনভাবে উঠে আসছে না। মনে হয়, কামিনী রায়ের সেই পঙ্ক্তি–‘পাছে লোকে কিছু বলে’–মানসিকতা প্রবল। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের দেড় বছর পরও সেই ভয় কাটেনি। প্রশ্ন জাগে–কারা সেই অদৃশ্য শক্তি, যারা অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী টেকনোক্র্যাট ও মতনির্ধারকদের কানে কানে কথা বলে সম্মিলিত চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে?
একটি গ্রাম বা ছোট শহরে বাস করলে আলাদা করে পরিচয় না দিলেও মানুষ আপনাকে চিনে নেয়। কিন্তু নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করলে অন্যরাই আপনার চলার শর্ত ঠিক করে দেয়। একটি দেশের ক্ষেত্রেও তাই। আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়মিত যোগাযোগ, সক্রিয় ভূমিকা এবং সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়া জাতীয় সম্মান অর্জন হয় না। সুনাম তৈরি হয় না। অবস্থানও দৃঢ় হয় না। বাংলাদেশকেও তাই নিজের জায়গা নিজেকেই তৈরি করতে হবে–নীরবে নয়, দৃঢ় উপস্থিতিতে।
দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু বাংলাদেশ কীভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে উপস্থাপন করবে, কাদের বন্ধু ভাববে এবং কীভাবে স্বাধীনভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করবে–এ প্রশ্নে এখনও রাজনৈতিক, আধা রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেখায়, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নীতিনির্ধারণ কে করেন, কীভাবে করেন এবং কেন করেন–সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই সীমিত। অথচ সেই নীতির ফল শেষ পর্যন্ত ভোগ বা বহন করতে হয় সব নাগরিককেই।
মাঝেমধ্যে বলা হয়, ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’ নাকি সবচেয়ে জরুরি কাজ। আবার এটিও সত্য, এই কাজ আজও অসম্পূর্ণ। যেন কাগজে লেখা কিছু বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই দেশটিকে বাইরের দুনিয়া চিনবে; বাস্তব শক্তি বা সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়। করপোরেট মানসিকতার কিছু চতুর মানুষ জাতীয় শক্তির উপাদান ও জননীতি গঠনের আগেই ব্র্যান্ডিংকে সামনে আনতে চান। অথচ এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি দেশ বৈদেশিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা সামাল দিতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। রাশিয়ার সের্গেই লাভরভ, ইরানের জাভেদ জারিফ, যুক্তরাষ্ট্রের কনডোলিৎসা রাইস বা ভারতের এস জয়শঙ্কর–কারও হাতেই এমন কোনো সহজ সূত্র নেই। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মানে একদিকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা নয়, আবার অন্যদিকে বড় শক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়াও নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নির্বাচিত ও নতুন নেতৃত্বের সামনে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ এনে দিয়েছে। অন্য সংস্কারের মতোই, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও জনগণের জানার অধিকার আছে। অন্তত জানা দরকার–এই নীতি কীভাবে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। কোনো বিদেশি শক্তি এই নীতি ঠিক করে দিতে পারে না। একক কোনো শক্তির প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক বা অতিরঞ্জিত হুমকি-বোধও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তকে গ্রাস করা উচিত নয়।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যে পররাষ্ট্রনীতি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিদেশি প্রভুদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত ছিল, সেখান থেকে সরে আসার সময় অনেক আগেই হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও তার জটিলতা নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ পররাষ্ট্রনীতি ঘরোয়া নীতির মতো একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর সাফল্য নির্ভর করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং অন্য রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপরও।
দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কেরা তাই সব সময় চোখ-কান খোলা রাখেন। নতুন ঘটনা, নতুন ভাবনা আর পরিবর্তনের ইঙ্গিত তারা উপেক্ষা করেন না। বিশ্ব যে কতটা গতিশীল, তা প্রতিদিনই চোখে পড়ে। যেমন–ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনা, দেশটির সার্বভৌমত্বকে বাস্তবে অকার্যকর করে দিয়েছে। এতে প্রচলিত ধারণা ভেঙে গেছে। একইভাবে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ২০২০ সালে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়–পররাষ্ট্রনীতি কোনো স্থির সূত্র নয়। এটি সময়, শক্তি ও বাস্তবতার সঙ্গে বদলায়। সেই পরিবর্তন বুঝে নেওয়াই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সচেতন বিবেক আজও বুঝে উঠতে পারে না–২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের গণহত্যা চলতে থাকলেও বিশ্ব কেন প্রায় নীরব। এই নীরবতা শুধু নিষ্ক্রিয়তা নয়, এটি এক ধরনের ভয়ংকর স্বীকৃতি।
একজন আশাবাদীর জন্য মেনে নেওয়া কঠিন যে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুই বিশ্বযুদ্ধের একটির সমাপ্তি ঘটানোর এক শতাব্দী পরও খুল্লামখুল্লা সামরিক শক্তির ব্যবহারকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছে বিশ্ব। আরও কঠোর বাস্তবতা হলো, নিজেকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ভারত জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটেও প্রভাব খাটাতে দ্বিধা করে না। তার ফলেই প্রতিবেশী বাংলাদেশ নিরাপদভাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এটাই সেই বিশ্ব, যেখানে চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ভারতের প্রতিবেশী ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, এবং একই ভারত আবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে রাশিয়ার সঙ্গে; যে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মিত্র ইউরোপের জন্য বড় হুমকি। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে ঘিরে ধরতে ভারতের অংশীদারিত্ব চাইছে।
এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরাশক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিধির মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশও। যে কোনো এক শক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়া জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন–রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা, যা মিয়ানমারের মতো প্রক্সি বিদ্রোহে জর্জরিত অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এড়াবে না।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে শুধু কার্যত বৈরী বিশ্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না; একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও প্রস্তুতি নিতে হবে। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার আলোকে পররাষ্ট্রনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করাই হবে তাদের বড় দায়িত্ব।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের মানুষকেই। তারা কী ধরনের দেশ গড়তে চায় এবং বিশ্ব তাদের কীভাবে চিনবে–এ প্রশ্নের উত্তর জনগণই দেবে। সংসদ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাঙ্গন ও সংবাদমাধ্যম–সব প্রতিষ্ঠানকে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এতে রাষ্ট্র সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা পাবে। পররাষ্ট্রনীতি কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একক বিষয় নয়।
গোপনীয়তার আড়ালে নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি বদলাতে হবে। একই সঙ্গে পেশাদার কূটনীতিকদের বুঝতে হবে–কোন সিদ্ধান্ত গোপন রাখা প্রয়োজন, আর কোনটি সচেতনভাবে প্রকাশ করা জরুরি। যোগ্য ও দেশপ্রেমিক পররাষ্ট্রনীতি–বিশেষজ্ঞদের একটি দলই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
khawaza@gmail.com
- বিষয় :
- খাজা মাঈন উদ্দিন