ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

শিশু ধর্ষণ ও বিচারের সংকট

শিশু ধর্ষণ ও বিচারের সংকট
×

মো. আসাদুজ্জামান

মো. আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১০:৫৪

বাংলাদেশের শিশুর নিরাপত্তা ও প্রচলিত আইনি কাঠামোর অকার্যকারিতার এক নজির হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিশু জান্নাতুল নিশা ইরার ঘটনা। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় ইরার ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, তা সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীর সংকটের প্রকাশ। আগের শিশু নির্যাতনের ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতি দায়ী থাকে নতুন নতুন নৃশংসতার ঘটনার পেছনে। 

শিশু নির্যাতন কেবল একটি অপরাধই নয়; এটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক অস্তিত্বে আঘাত, যা তাকে বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। আর সেই ক্ষত থেকে রেহাই মিলবে না তার পরিবার ও সমাজেরও। গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও জামিনের চক্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেয়ে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা যেন অপরাধীকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয় বাংলাদেশে। 

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতনের হার কেবল বৃদ্ধিই পায়নি, এর নৃশংসতাও দাঁড়িয়েছে বহু গুণ। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২৫ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো পূর্ববর্তী বছরগুলোর রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরে কন্যাশিশু ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৬। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসে ২২৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ২০২৫ সালে একই সময়ে ধর্ষিত হয়েছে ৩৯০ জন। 

২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে পাওয়া যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৪৯ জন ছিল ৬ বছরেরও কম বয়সের। ৯৪ জন ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। এই চিত্রটি নির্দেশ করে– দুগ্ধপোষ্য শিশুরাও এই পৈশাচিক নৃশংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। 

পরিসখ্যানে কেবল নথিভুক্ত মামলার সংখ্যাই প্রতিফলিত হয়। কিন্তু এর বাইরে বিশাল একটি অংশ লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ২০-৩০ শতাংশ ঘটনা সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয় অথবা ভয়ে প্রকাশ করা হয় না। ‘জাস্টিস গ্যাপ’ বা বিচারের ব্যবধানই অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং ভুক্তভোগীদের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীন করে তোলে ।   

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) কার্যকর রয়েছে। এই আইনের ৯(১) ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও অপরাধ কমছে না কেন– তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর বিতর্ক রয়েছে। 

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। ঢাকা জেলার ট্রাইব্যুনালগুলোতে ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আসা মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে সাজা হয়েছে বলে জানা যায়। বাকি ৯৭ শতাংশ আসামি প্রমাণের অভাব বা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এই নিম্ন সাজার হারের পেছনে তদন্তের ত্রুটি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ডিএনএ পরীক্ষায় বিলম্ব, আসামি প্রভাবশালী হলে সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরও উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়াই প্রধান। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের মধ্যস্থতায় ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা করার চেয়ে আপস করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় ধর্ষণ একটি আপসহীন অপরাধ হলেও বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘সালিশ’ বা ‘ফতোয়া’র মাধ্যমে আপসের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ। 

শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা প্রাপ্তবয়সেও অনেক সময় মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে না। নির্যাতিত শিশুদের মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা, বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। ভয়াবহ বিষয় হলো ‘রি-ভিকটিমাইজেশন’। শৈশবে একবার নির্যাতিত হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে আবার নির্যাতনের শিকার হওয়ার দুই থেকে চার গুণ ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া অনেক শিশু ভবিষ্যতে নিজেও অপরাধী হয়ে উঠতে পারে সঠিক কাউন্সেলিংয়ের অভাবে।    

তাই বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি কঠোর ও শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যে ব্যবস্থায় দ্রুত বিচার ও শাস্তির বিধান নিশ্চিত হবে। 

আগে বিভিন্ন সময়ের দাবির প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ড) নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বর্তমান কাঠামোয় থাকা দুর্বল ব্যবস্থাগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। যেমন শিশুদের সঙ্গে পুলিশের সংবেদনশীল আচরণ, প্রতিটি থানায় ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি ডেস্ক’ তৈরি, বিভাগীয় পর্যায়ে ডিএনএ টেস্ট ও ফরেনসিক পরীক্ষার সুবিধা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি। 

এর মধ্যে ২০২৫ সালের নতুন সংশোধন অধ্যাদেশ কিছুটা আশা জাগায়। বিশেষ করে ছেলেশিশুদের সুরক্ষাকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্তগুলো সময়োপযোগী। তবে সীতাকুণ্ডের ইরা হত্যার ঘটনা বিচারহীনতার অন্ধকারে প্রবেশ করলে পুরো সমাজ এই অপরাধের অংশীদার হবে। আইন কাগজ-কলমে থাকলে চলবে না; তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সীতাকুণ্ডের পাহাড় থেকে শুরু করে রাজধানীর অলিগলি– কোথাও যেন আর কোনো শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মতো পৈশাচিকতার শিকার হতে না হয়। 

মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
asad@law.ku.ac.bd

আরও পড়ুন

×