ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিলাদুন্নবী (সা.)

প্রিয়নবীর মানবমুক্তির শিক্ষা বনাম কারবালার ইতিহাস

প্রিয়নবীর মানবমুক্তির শিক্ষা বনাম কারবালার ইতিহাস
×

মদিনায় মসজিদে নববি

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৫ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২৬

মানুষের তৈরি সমস্ত শৃঙ্খল, বৈষম্য এবং দাসত্ব দূর করে একটি সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি কখনোই কোনো বংশগত রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্য বা ক্ষমতার মসনদ প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। প্রিয়নবীর সুমহান আদর্শ ছিল মানুষ যেন শুধু মহান আল্লাহর ইবাদত করে এবং অন্য কোনো মানুষের দাসত্ব বা মনস্তাত্ত্বিক গোলামিতে না জড়ায়।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাঁকে, প্রিয়নবীর তিরোধানের ঠিক পরপরই ইসলামের সেই মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আত্মাকে জবরদস্তি বন্দি করা হলো রাজমুকুট আর স্বৈরাচারের খাঁচায়।

কারবালার পেছনের সত্য ইতিহাস
৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ খেলাফতকে পারিবারিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দেন এবং জোরপূর্বক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ দাবি করে। তিনি চেয়েছিলেন প্রিয়নবীর দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) এবং অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবীরা তার অবৈধ রাজতন্ত্রের সামনে মাথা নত করুক।
সে সময় কুফার সাধারণ মানুষ, যারা প্রিয়নবীর পরিবারের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিল, তারা শত শত চিঠি পাঠিয়ে হজরত হুসাইনকে (রা.) কুফায় আসার অনুরোধ জানায়। তারা আশ্বস্ত করে যে, প্রিয়নবীর পরিবারই তাদের প্রকৃত পথপ্রদর্শক এবং তারা তাঁর হাতে হাত রেখে বায়াত নেবে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে দিতে ইয়াজিদ তার নিষ্ঠুর সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফায় পাঠায়।
ইবনে জিয়াদ কুফায় প্রবেশ করে চরম ভয়ভীতি, হুমকি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেয়। সাধারণ মানুষ ও কুফাবাসীকে ভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তারা বাধ্য হয় ইয়াজিদের সেনাশক্তির আনুগত্য প্রকাশ করতে।
হজরত হুসাইন (রা.) এই অবৈধ ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তাঁর মতো মানুষ কোনো অবস্থাতেই ইয়াজিদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত ও পাপিষ্ঠ শাসকের কাছে মাথা নত করবেন না। এরপর কারবালার মরুপ্রান্তরে তাঁর পরিবার ও মাত্র ৭২ জন সঙ্গীকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পানি বন্ধ করে দিয়ে এক পৈশাচিক কায়দায় তাঁদের নির্মমভাবে শহীদ করা হয়।

রাজতন্ত্র ও ইসলামের বাণিজ্যিকীকরণ
কারবালার সেই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে যে রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী ধারা শুরু হয়েছিল, তার আধুনিক উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে। মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমির প্রতি মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশেও সহজ-সরল মানুষের মনে ইসলামের নামে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ভয় এবং কৃত্রিম গোঁড়ামি। এর ফলে দেশের পরিশ্রমী মানুষগুলো জীবিকার অন্বেষণে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবের মরুপ্রান্তরে পাড়ি জমালে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে ঠিকই, কিন্তু এক অদৃশ্য দাসত্বের শৃঙ্খল সবসময় তাদের পা জড়িয়ে রাখে। 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং ফিলিস্তিনের আয়না
আজকের এই সংকটময় সময়ে, যখন ফিলিস্তিনের গাজায় মানবতা চরম বিপন্ন এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি রক্ত ঝরাচ্ছে, তখন সেই তথাকথিত ধনী রাজতন্ত্রগুলোর ভূমিকা কী? সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো রাজপরিবার কি ফিলিস্তিনের পক্ষে সত্যিকার অর্থে দাঁড়িয়েছে? তারা কখনোই ফিলিস্তিনের মুক্তি চায় না, কারণ তাদের ক্ষমতা টিকে আছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কৃপায়।
পক্ষান্তরে, আজকের এই দিনে আমাদের সাহসের সাথে স্বীকার করতে হবে যে, এই রাজতন্ত্রগুলোর বিপরীতে একমাত্র ইরান এবং তার মিত্ররাই ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, প্রকাশ্যে ইসরায়েল ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফিলিস্তিনের মুক্তির প্রশ্নে আজ কে কার পক্ষে আর কে কার বিরুদ্ধে, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

আমাদের আত্মোপলব্ধি ও মুক্তির ডাক
যতদিন না আমরা মানসিকভাবে এই রাজতন্ত্র ও ওয়াহাবি সংস্কৃতির গোলামি থেকে মুক্ত হব, ততদিন না প্রবাসের মরুপ্রান্তরে আমাদের মানুষের শারীরিক দাসত্ব ঘুচবে, আর না আমাদের দেশের মানুষের আত্মা স্বাধীন হবে।
কারবালার প্রকৃত শিক্ষা কোনো কান্না বা হাহাকার নয়; এটি হলো যেকোনো ধরনের জুলুম, রাজতন্ত্র এবং ক্ষমতার অহংকারের বিরুদ্ধে চিরকালের এক আপসহীন প্রতিবাদ। প্রিয়নবীর (সা.) আসল শিক্ষা- প্রেম, ন্যায়বিচার ও মানবতার ইসলামকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের ঘরে ঘরে। ভয়ের দেয়াল ভেঙে এবং এই মনস্তাত্ত্বিক গোলামি থেকে বেরিয়ে আসার দায়িত্ব আজ আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×