অন্যদৃষ্টি
প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবচ্ছেদ
মোর্শেদা বাঁধন
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে থাকেন, তখন তিনি শুধু শিক্ষা দেন না; দেশের ভিত গডে় তোলার কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁর প্রধান কাজ পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের পাশে থাকা এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব হলো পাঠদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়া, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া এবং কার্যকর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তবতা ভিন্ন। শিক্ষককে কখনও ডিম-রুটি-কলা বিতরণ, কখনও উপবৃত্তির কাজ, কখনও বিভিন্ন জরিপ ও তথ্য সংগ্রহ, আবার কখনও অসংখ্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
উপবৃত্তির কাজ অনেক জটিল। প্রতিটি শিশুর অভিভাবককে সার্বিক তথ্য অনলাইনে হালনাগাদ, রেজিস্টার্ড মোবাইলের সঙ্গে তাদের আইডি নম্বর মেলানো, শিশুর জন্মনিবন্ধনে তাদের অভিভাবকদের তথ্যের সঙ্গে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য যাচাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে উপবৃত্তির সার্ভার, বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট কানেকশনের সীমাবদ্ধতা। একই সঙ্গে বিগত ১৫ বছরে উপবৃত্তি কার্যক্রমে বিকাশ, নগদ ও রকেট ব্যবহারে নয়ছয় সবার জানা। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকও ব্যস্ত থাকেন নানা প্রতিবেদন, ফাইল, নথিপত্র, অফিস সরবরাহ ও দাপ্তরিক কাজে। যে সময়টি শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় হওয়ার কথা, সেটিই ব্যয় হচ্ছে কাগজপত্রের পেছনে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার গুণগত মান।
প্রাথমিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত বলাই বাহুল্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সাধারণত নিয়ম ১:৪০। মানে একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রছাত্রী থাকছে। আবার বিপরীত চিত্রও আছে। যদি ৪০ জন শিক্ষার্থীও ধরি, তাহলে ৫৫ মিনিট সময়ের ভেতরে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে যাচাই, ওই দিনের পাঠসংশ্লিষ্ট বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া, গতদিনের পাঠের অবস্থান যাচাই করা এবং পরবর্তী দিনের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া বাস্তবে কতটা সম্ভব– প্রশ্ন থেকেই যায়।
অন্যদিকে দুই শিফটের বিদ্যালয়ের পাঠদানের সময় আরও কম, মাত্র ৩৫ মিনিট। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বাংলা, গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা প্রতিটি বিষয় তথ্যবহুল। শিশুদের অজানা মনে নতুন কোনো তথ্য দিতে হলে তাকে সেটা ব্যাখ্যা করে বোঝানো জরুরি। সে জন্য প্রাথমিকে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১:২০ হলে অধিকতর কার্যকরী হতে পারে।
সারাদেশের তিন লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষকের মধ্য থেকে গুটিকয়েক শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক এমন নয়।
এ দেশে অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন, যাদের ধ্যান-জ্ঞান অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন এবং একজন সফল শিশু তৈরিতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা। দুঃখজনক হলেও সত্য, এমন শিক্ষকের স্বীকৃতির ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতনও এ ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবশ্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবহেলা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত সরকারি কর্মচারী।
শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে চাইলে নতুন নতুন দায়িত্ব নয়; শিক্ষককে তাঁর শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রধান শিক্ষককে কাগজের ফাইল নয়, বিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্বে সময় দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় তখনই, যখন যথাযথ সম্মানের সঙ্গে শিক্ষক পাঠদানে নিবেদিত থাকেন এবং মাথা উঁচু করে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার নেতৃত্বে মনোনিবেশ করতে পারেন।
মোর্শেদা বাঁধন: সহকারী শিক্ষক, খুলনা
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি