ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনুন

চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনুন
×

এএসএম সাইফুল্লাহ 

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৯

চকরিয়া সুন্দরবন ততটা পরিচিত নয়, যতটা আমরা খুলনা অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনকে চিনি। পৃথিবীর মোট ম্যানগ্রোভ বনের ৫ শতাংশ রয়েছে বাংলাদেশে এবং এর বেশির ভাগই রয়েছে সুন্দরবনজুড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক ম্যানগ্রোভ বন এই সুন্দরবনও এখন নানা কারণে হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের নানামুখী দখলদারিত্বে এই বিশাল বন যে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে; তা গবেষণাসহ নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও প্রতীয়মান। তবে যে বনটি একেবারেই আমাদের চোখের সামনে হারিয়ে গেল, সেটি মাতামুহুরী নদীর চারটি বাঁক থেকে সৃষ্ট চতুষ্টয়ে জন্ম নেওয়া চকরিয়া সুন্দরবন। সুন্দরী গাছের আধিক্যের কারণে সুন্দরবন নাম হলেও এর প্রাকৃতিক নান্দনিকতাও ছিল অপরূপ। দখলদারদের দখলদারিত্ব আর লুটপাটের কারণে চোখের সামনে এই ম্যানগ্রোভ বনটি নাই হয়ে গেল। সরকার তার মেয়াদে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে পরিকল্পনা নিয়েছে, এর সবচেয়ে কার্যকরী উদ্যোগ হতে পারে অন্তত চকরিয়া সুন্দরবনকে ফিরিয়ে আনা। 

১৯০৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর সরকারিভাবে চকরিয়া সুন্দরবন রেঞ্জ গঠন করা হয় এবং সেখানে আট হাজার ৫১০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনকে রিজার্ভ এবং বাকি সাত হাজার ৪৯০ হেক্টর সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চকরিয়া বনভূমির ওপর মানুষের লোলুপ দৃষ্টির সূত্রপাত ১৯২৬ সালে, যখন এক হাজার ৬০০ হেক্টর জমি কিছু পরিবারকে বসতি স্থাপনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। চকরিয়া সুন্দরবনের গাছগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণে এলাকাটি মাছের জন্য আর প্রজননক্ষেত্র থাকল না। বন মানেই বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। বন হারিয়ে গেছে, বনের প্রাণীরাও হারিয়ে গেছে। যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে অন্যত্র চলে গেছে, বাকিরা বিলুপ্ত। চকরিয়া সুন্দরবন বিভিন্ন ধরনের পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, উভচর এবং মাছের জন্য খুব ভালো আবাসস্থল ছিল। বন ধ্বংসের কারণে এ প্রাণীগুলো তাদের আবাস হারাতে শুরু করে।

ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণে বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমির ক্ষয়, পরিবর্তিত হচ্ছে উপকূলের সীমানা রেখা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তো বেড়েই যাচ্ছে। ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় অঞ্চলে অনেকটা ব্যূহ তৈরির মাধ্যমে মানুষসহ স্থলভাগের অন্যান্য প্রাণী ও সম্পদের সুরক্ষা দেয়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বনের পরোক্ষ উপকারকে আমরা টাকার অঙ্কে মূল্যায়ন করতে পারি না। যেমন সম্ভব নয় জীবনের দাম নির্ধারণ। মানুষ তার এই সুরক্ষাকারীকে অবিবেচকের মতো হত্যা করছে প্রতিনিয়ত। ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণে জীবের চারণক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সামুদ্রিক, মোহনা এবং মিঠা পানির মৎস্য সম্পদের পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। সর্বোপরি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নির্দেশনার অভাবের কারণে ভূমি ব্যবহার নিয়ে নিত্য দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে এসব এলাকায়।

সোনার ডিম দেওয়া হাঁসটি জবাই করে একবারে সব কেড়ে নেওয়ার মতো আমরা চকরিয়া সুন্দরবনকে ধ্বংস করে দীর্ঘ মেয়াদে পাওয়া যাবে– এমন সব সম্ভাবনাকে কবর দিয়েছি এবং নিজেদের দাঁড় করিয়েছি বিপৎসংকুল এক অবস্থানে। গাছের গায়ে কুড়াল মারতে গিয়ে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে গেলে আমাদের উপকূলে জেগে ওঠা চরগুলো হতে পারে যোগ্য স্থান। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে জেগে ওঠা চরগুলো রক্ষা এবং উপকূলবাসীকে বাঁচাতে ম্যানগ্রোভ বনায়ন বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। খুলনা সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে সাগরের উপকূলে জেগে ওঠা ডিমের চর, যাকে আমরা নাম দিয়েছি চর প্রশান্ত, সেটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই ম্যানগ্রোভ রোপণ করা উচিত। সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হতে পারে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবনকে ফিরিয়ে আনা। এটি হতে পারে বনায়নের মাইলফলক উদাহরণ।

ড. এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  
saifullahasm@yahoo.com

আরও পড়ুন

×