ব্রিকস সম্মেলন
নয়াদিল্লি ঘোষণায় ধরি মাছ না ছুঁই পানি
আজাদেহ মশিরি
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১২
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকজন মানুষ দিল্লির গোলাকার এক বিশাল টেবিলের চারপাশে মিলিত হয়েছিলেন এ সপ্তাহের শেষে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে ঘোষণা করেন– পাশে থাকা নেতাদের বিশ্বের ‘নিয়মের অনুগত’ নয় বরং ‘নিয়মপ্রণেতা’ হওয়া উচিত। তাঁর শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। তারা পারস্পরিক মিত্র নন। তাদের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ, সামরিক সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে।
ব্রিকস সম্মেলনের সফলতা সম্ভবত যৌথ ঘোষণা জারিঅ কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার বিভাজন কম নয়। চলতি বছরের শুরুতে ব্রিকস মন্ত্রীরা দুবার যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এবার তারা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে দেশগুলোর যেসব বিষয়ে তীব্র দ্বিমত ছিল, সেগুলো এড়িয়ে অল্প কিছু সমাধানের সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছেছেন। সম্মেলনের প্রথম দিনে ‘নয়াদিল্লি ডিক্লারেশন’-এ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিষয়ে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা বেসামরিক অবকাঠামো এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার তীব্র নিন্দা জানালেও কারও ওপর দোষ চাপাননি।
নয়াদিল্লি ঘোষণায় দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান বিষয়ে সবাই সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা অথবা যেসব পদক্ষেপ দখলদারিত্বকে বৈধতা দিতে পারে বা দীর্ঘায়িত করতে পারে, সেগুলোর বিরোধিতা করেন। সেগুলোকে জাতিসংঘ প্রস্তাবের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কথা উল্লেখই করা হয়নি। অথচ পূর্ববর্তী ব্রিকস সম্মেলনের ঘোষণাগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলা আছে।
বাণিজ্যক্ষেত্রেও ব্রিকসের সতর্কতা উল্লেখযোগ্য। তারা ‘নির্বিচারে শুল্ক বৃদ্ধি’ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেননি। হতে পারে, ওয়াশিংটনের ক্ষোভ এড়ানোর জন্যই নাম বলা হয়নি।
ব্রিকসের বেশ কিছু সদস্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ নিয়ে সংযত থাকতে চেয়েছে। ট্রাম্প এর আগে ব্রিকসের প্রস্তাবগুলোকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ বলে উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে ছিল আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা সংযুক্ত করার বিষয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের নিন্দা জানালেও কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করা ভারতের কৌশলের প্রভাব প্রকাশ করে।’ তাঁর মতে, শুল্ক বিষয়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থান জানানোর মাধ্যমে তারা তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
তবে ট্রাম্পের বাণিজ্য হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা ব্রিকসের সদস্য অনেক দেশের অর্থনীতির জন্যই জরুরি। এই সম্মেলন সেই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে, যা মাত্র কয়েক মাস আগে কল্পনা করাও কঠিন বলে মনে হয়েছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স একসঙ্গে আলোচনার জন্য বসেছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই দুই দেশের মধ্যে এটিই সম্ভবত সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠক। এই সম্মেলন তেহরানকে এটি দেখানোর সুযোগ এনে দিয়েছে– যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তারা একা নয়।
যেহেতু ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি করেছে। এর মোকাবিলায় পেজেশকিয়ান মালয়েশিয়া, ভারত, ইথিওপিয়াসহ ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর জোর দেন।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগদান সাত বছরের মধ্যে দিল্লিতে প্রথম সফর ছিল। ২০২০ সালের সীমান্ত বিরোধের পর থেকে চীন ও ভারতের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস জন্মেছিল। সেই উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। সেখানে চীনের পক্ষে বড় বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও রয়েছে। এর পরও চীন-ভারত দুই দেশের জটিল সম্পর্কের মধ্যে সপ্তাহের শেষ মুহূর্তের বড় ঘটনা ছিল। দুই নেতা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন সংযোগ জোরদার এবং বাণিজ্যের বাধা দূর করতে সম্মত হয়েছেন। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্কের ধারাবাহিক উষ্ণতার অংশ এবং উভয় পক্ষের একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। তবে এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কিনা তা দেখার বিষয়।
আজাদেহ মশিরি: বিবিসির দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি, বিবিসি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- ব্রিকস সম্মেলন