উচ্চশিক্ষা
সাত কলেজ: সমাধানের নামে নতুন সমস্যার জন্ম?
রাজু নূরুল
রাজু নূরুল
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৪
ঢাকা মহানগরের ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দিক দেখভালের জন্য চলতি বছরের এপ্রিলে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন, ২০২৬’ গেজেট আকারেও প্রকাশিত হয়েছে। উপাচার্যসহ চারটি পদে জনবল নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললেই নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন নতুন খবর চোখে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে চলছে নানামুখী আন্দোলন। আশঙ্কা হলো, সত্যিই সাত কলেজের দীর্ঘদিনের ‘সমস্যার’ সমাধান হচ্ছে, নাকি নতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে?
২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে। যদিও নব্বইয়ের দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে এসব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিল; কিন্তু ২০১৭ সালে কোনো গবেষণা, প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া কেন এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি রহস্য। শোনা যায়, সে সময় এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এই অধিভুক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
অধিভুক্তির পর কলেজগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন ও কলেজ পরিদর্শনের মতো মৌলিক কাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করতে পারেনি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সনদ দেওয়া ছাড়া। বরং কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সেশনজট, পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, অনিশ্চিত রুটিনের চাপে পড়েছে। অপরদিকে সাত কলেজের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এসব থেকেই জন্ম হয়েছিল ক্ষোভের। শিক্ষার্থীরা বারবার রাস্তায় নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পড়ে যায়। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা নতুন উদ্যমে ক্লাস বর্জন, রাস্তা অবরোধ করতে থাকে। আন্দোলনের চাপে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে নিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। নানা আজগুবি ঘোষণার পর শেষ পর্যন্ত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আলোচনায় যবনিক পড়ে।
আইনটির ২(২৪) ধারামতে, সাত কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ধারা ২(১) অনুযায়ী, কলেজগুলোর অধ্যক্ষ কলেজের প্রশাসনিক নেতৃত্বে থাকবেন। ধারা ৪(৩) মতে, ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সংযুক্ত কলেজের নিজস্ব পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ অন্যান্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।
তাহলে এখন সমস্যাটা কী নিয়ে? মোটাদাগে সমস্যা দুটো– আইন লঙ্ঘন ও অবিশ্বাস। আইনের ৫৬(২) ধারা অনুযায়ী ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শুধু ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে সনদ প্রদান করবে। তার আগেরগুলো শেষ করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় আগের তিন সেশনের শিক্ষার্থীদেরও তাদের অধীনে আনার চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীরা বলছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোই এখনও ঠিক হয়নি, লোকবল নিয়োগও সম্পন্ন হয়নি, তাদের অধীনে গিয়ে আমরা নতুন করে বিপদে পড়ব নাকি? এই ইউনিভার্সিটির দেওয়া সার্টিফিকেট কি দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে?
অবিশ্বাসের বিষয় হলো, অংশীজনের আশঙ্কা, ক্রমান্বয়ে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এই কলেজগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল করবে। বর্তমান কাঠামো ভেঙে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করবে। আশঙ্কা উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এই ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তারা আইন লঙ্ঘন করে কলেজগুলোকে ‘সংযুক্ত’ হিসেবে উল্লেখ না করে ‘সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস’ বলছেন। অথচ অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস তৈরির কথা বলা আছে। যতদিন ক্যাম্পাস তৈরি না হবে, ততদিন তারা ভাড়া বিল্ডিংয়ে তাদের নিজস্ব শিক্ষার্থীদের ক্লাস করাবেন।
কলেজগুলোতে বর্তমানে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কমবেশি ১৩শ শিক্ষক কর্মরত। তাদের আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলে কলেজের নিজস্ব কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পদগুলোও বিলুপ্ত হবে। এর মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য বলেছেন, ‘কলেজের শিক্ষক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে না।’
উপাচার্যের এমন বক্তব্যের নেপথ্যে অনেকে ‘নিয়োগ বাণিজ্যের লোভ’ দেখছেন। নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারলে কেবল উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তারা নন; রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্যান্য মহলেরও পোয়াবারো বৈ কি!
অবিশ্বাসের আরও জায়গা আছে। সরকারি তিতুমীর কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজ ছাড়া বাকি পাঁচ কলেজে এখনও উচ্চ মাধ্যমিক চালু আছে। এসব কলেজ শুধু ঐতিহ্যের কারণেই নয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মানসম্মত উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা দিয়ে আসছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় কি কলেজ থাকবে? যদি থেকেও যায়, তা কি সগৌরবে থাকতে পারবে?
প্রতিবছর বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ২৩ হাজার শিক্ষার্থী এসব কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য না থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এই কলেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলে মাত্র হাজার দুয়েক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবে হয়তো। বাকিদের তখন কী হবে?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া অনেক নারী শিক্ষার্থীরও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসা ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ। এ দুটি প্রতিষ্ঠান একক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিলীন হলে নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে না?
বস্তুত সাত কলেজের প্রশাসনিক কাজ ও সনদ বিতরণের জন্য গোটা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে ফেলা, সেখানে কলেজের লোকজনকে নিয়োগ না দিয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনবল নিয়োগ যেমন সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, আবার এই সাত কলেজ নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য বহু পক্ষকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সাত কলেজ নিয়ে অনির্বাচিত সরকারের তুঘলকি কাণ্ডের পর এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা; সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা গভীরভাবে বিশ্লেষণ; শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ; শিক্ষকদের চাকরির কাঠামো; কলেজগুলোর ঐতিহ্য ও বর্তমান কার্যক্রম; অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ অর্থায়ন– সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রণয়নে অসুবিধা কোথায়?
রাজু নূরুল: লেখক ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ
raju_norul@yahoo.com
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা