ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের আমদানি কূটনীতি

বাংলাদেশের আমদানি কূটনীতি
×

প্রতীকী ছবি

রাজীব চক্রবর্তী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:০৭

২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে বাংলাদেশ মোট ছয় লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে, যার ৪৩ শতাংশ এসেছে চীন ও ভারত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৫৭ কোটি ডলারের। সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের বৈঠকে বর্তমানে দুই দেশের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।  
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকের বক্তব্যে ভারত বিরোধিতার কঠোর অবস্থান থাকলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। 

কিছুদিন আগে কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা হলে ভারত থেকে কাঁচামরিচ রপ্তানির সঙ্গে সঙ্গে হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে তা নেমে আসে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। 

দীর্ঘ কয়েক বছর ভিসা প্রক্রিয়া অনেকটা বন্ধ থাকার পর খোলার দিনই সারাদেশের ভারতীয় ভিসা সেন্টারে দেড় লাখের মতো আবেদন জমা পড়ে। চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশিদের বিশাল অংশ ভারতে যায়। কলকাতার অনেক হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীর কম হওয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পশ্চিমবঙ্গের আগের সরকার বলেছে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও খুব সহজে ভারত পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জ্বালানি পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে।  

চীন, ভারত দুই দেশই যুদ্ধে জড়িয়েছে। এখনও লাদাখসহ অরুণাচল নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এলএসি বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় সৈন্যরা মুখোমুখি। আবার বাণিজ্যও চালাচ্ছে দুই দেশ। বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে দুই দেশ এক। 

এ কথাও সত্য, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন থেকে বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের চেয়ে চার গুণ এবং ভারতের বিনিয়োগ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ সময় চীনা বিনিয়োগকারীরা ২৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, আর ভারত থেকে এসেছে ১৩ কোটি ডলারের বিনিয়োগ। অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিক আমদানির প্রেক্ষাপটে ভারতের বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। যেটা চীন করে যাচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সীমানা না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতিতে চীনের প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো– মেগা প্রকল্পে শত শত কোটি ডলারের ঋণ দিয়েছে বেইজিং।  

এলডিসি শুল্ক সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশকে যেমন ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর বাজার ধরতে হবে, তেমনি ভারতকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে। স্থলপথের মতো সহজ, কম সময়ে ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশ যেমন দ্রুত আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি মেটাতে পারছে, তেমনি বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের বিশাল আমদানি ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তাই বাংলাদেশের এই বিশাল আমদানি, কূটনীতিতে দরকষাকষি বা  পারস্পরিক  স্বার্থসংশ্লিষ্ট বোঝাপড়ায় ভারতের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে। 

ড. রাজীব চক্রবর্তী: গবেষক 

আরও পড়ুন

×