ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

পিংক বাস, নারী ও ক্ষমতা সম্পর্ক

পিংক বাস, নারী ও ক্ষমতা সম্পর্ক
×

আহাদ হোসেন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারী যাত্রীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও হয়রানিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘পিংক বাস সার্ভিস’। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ব্যস্ত রুটের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও প্রাথমিকভাবে এই সেবা বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা সাধারণভাবে নারী নিরাপত্তা, হয়রানি দূরীকরণের একটা বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ভাবা হলেও এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সমাজের আচরণের প্রতিচ্ছবিকে তুলে ধরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর ঘটনাকেও একটি বিচ্ছিন্ন পরিবহন উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায় না।

সরকারের নির্দেশনায় নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর মধ্য দিয়ে নারীদের চলাচল, নিরাপত্তা এবং জনপরিসরে তাদের অবস্থানকে একটি বিশেষ সামাজিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত করা হয়েছে। নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর ফলে যে আলাদাকরণের প্রবণতা বা সামাজিক ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে, তা বিদ্যমান সমাজের মূল্যবোধ, লিঙ্গ-সম্পর্ক ও ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই পৃথককরণ একদিকে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় সামনে নিয়ে আসে, অন্যদিকে নারী ও পুরুষের জন্য জনপরিসরকে কী প্রকারে আলাদাভাবে কল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা হয়, সেই সামাজিক ধারণাকেও দৃশ্যমান করে। অতএব, পিংক বাস বা নারীদের জন্য পৃথক বাসকে শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। মূলত বাসটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থান, যেখানে নারী পরিচয়, নিরাপত্তাবোধ, পারস্পরিক আচরণ, সামাজিক শ্রেণি, লিঙ্গ-সম্পর্ক এবং ক্ষমতার সম্পর্ক প্রতিনিয়ত প্রকাশিত ও পুনর্নির্মিত হয়। 

সমাজে প্রচলিত মূল্যবোধ ও আদর্শের মধ্য দিয়েই মানুষ শেখে– কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং কীভাবে নিজেকে পরিচালনা করতে হবে। নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর পেছনে নারীর নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অর্থাৎ নারীদের গণপরিবহনে চলাচলকে এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তাদের জন্য পৃথক ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান প্রয়োজন। ফলে নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পরিণত হয়। পিংক রং, নারীদের জন্য নির্দিষ্ট বাস এবং এর চারপাশে তৈরি হওয়া সামাজিক আলোচনা মিলে একটি বিশেষ ‘নারী পরিচয়’ দৃশ্যমান করে। এখানে নারীকে একই সঙ্গে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যক্তি ও বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে পরিবহন ব্যবস্থা নিজেই নারী পরিচয় নির্মাণের একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম হয়ে ওঠে।

বেনেডিক্টের ধারণা অনুসারে আচরণকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে দেখতে হয়। সেই দৃষ্টিতে নারীদের জন্য পৃথক বাস চালু হওয়া সমাজের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। এটি একই সঙ্গে সমাজে বিরাজমান আচরণ ও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক সম্পর্ককে পাঠ করতে সহায়তা করে। যেখানে ‘পিংক’ হয়ে ওঠে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরে নারীর জন্য নির্ধারিত নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও পৃথক পরিসরের প্রতীক।

অর্টনার তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সংস্কৃতিতে নারীকে ‘প্রকৃতি’ এবং পুরুষকে ‘সংস্কৃতি’র সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত করা হয়। ফলে নারীর শরীর, চলাচল, যৌনতা ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ন্ত্রণের নানা সাংস্কৃতিক যুক্তি তৈরি হয়। অর্থাৎ নারীকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা নিজেই একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এ ক্ষেত্রে ‘পিংক’ রং তাই শুধু নারীবান্ধব বা নিরাপত্তার প্রতীক নয়।
অর্টনারের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে বলা যায়– নারীদের জন্য পৃথক স্থান তৈরির মধ্য দিয়ে সমাজ নারীকে একটি বিশেষ, পৃথক ও নিয়ন্ত্রিত সামাজিক অবস্থানের মধ্যে চিহ্নিত করে। সুতরাং পিংক শুধু যানবাহন নয়, বরং এটি নারীকে ঘিরে সমাজের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আচরণ, নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমান প্রতীক।

আহাদ হোসেন: নৃবিজ্ঞানী ও গবষেক

আরও পড়ুন

×