প্রশাসন
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন নয়
উশ্যেপ্রু মারমা
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন বোর্ড বরাবরই সরকারদলীয় নেতাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন গত ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতারা ওই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে; সরকারি নানা প্রকল্প থেকে দুর্নীতি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকারও দলীয় নেতাকর্মীকে নতুন জেলা পরিষদে নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির আলোকে গঠিত পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদে শুরু থেকে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জেএসএসের নেতারা বসে আছেন। বলা যায়, গত ২৫ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষভাবে ক্ষমতায়িত এ প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সার্বিক উন্নয়ন, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ইত্যাদি কাজে তেমন কাজে আসেনি।
বলা হচ্ছে, নির্বাচন করতে হলে চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ের নিজস্ব ভোটার তালিকা লাগবে। সরকার চাইলে সেটি অসম্ভব নয়। কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সেগুলোতে বসিয়ে রেখে জনগণের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে টাকাওয়ালা হিসেবে গড়ে তুলতে এ সরকারও যেন আগ্রহী।
চুক্তি-পরবর্তী রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতে দ্বন্দ্বের ফলে পাহাড়ে অনেক লোক খুনের শিকার হয়েছেন। অথচ সরকার বা আঞ্চলিক দলগুলো আলোচনা করে যদি নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলো পরিচালনা করত তাহলে এত সমস্যা হতো না। কারণ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা তখন একটি বিশৃঙ্খল জনপদকে গড়ে তুলতে যথাযথ ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে সহজে পারত, যা অনির্বাচিত চেয়ারম্যানদের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং। এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে পাহাড়ে এমন একটি দায়িত্বহীন রাজনৈতিক প্রজন্ম গড়ে উঠেছে; যারা মনে করছে, জেলা পরিষদে একবার চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারলে তাদের সারাজীবনের রোজগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
একটি সশস্ত্র সংঘাতের পর গেরিলারা অস্ত্র সমর্পণ করলেও তারা যেমন রাষ্ট্রীয় জীবনের নিশ্চয়তা পায়নি, তেমনি জনগণের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িত ভূমিব্যবস্থা, শান্তি ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ইত্যাদি বিষয়ে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরা বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি।
সত্য, আঞ্চলিক দলগুলো রাজি না হলে সমতলের মতো স্বাভাবিক নির্বাচন করা একেবারে অসম্ভব। তবে একটি দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে ব্যর্থ বলে নির্বাচনের আলোচনা কখনও জাতীয়ভাবে উত্থাপিত হয়নি। একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলকে অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা দীর্ঘদিন পরিচালনা করতে গিয়ে পাহাড়িদের নিয়ে সারাদেশে অপপ্রচার করা হচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিবিদরা পাহাড়ের বিষয়ে দায়িত্বহীন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে থাকেন। পাহাড়ের সমস্যা কেউ বিশ্লেষণ করছেন না। গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় ব্যাপক দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতাকে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হতে পারে, পাহাড়িরা কেন এ রকম অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে? আঞ্চলিক দলগুলো এ ব্যাপারে কেন সোচ্চার নয়? পাহাড়ের তিন রাজা যেমন স্থায়ী হিসেবে পরিবর্তন হয় না, তেমনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্বাচন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। এটি একটি জনগোষ্ঠীকে অস্বচ্ছ পদ্ধতি ও দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে নিমজ্জিত রেখে অসুস্থ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার ষড়যন্ত্র কিনা– সে প্রশ্ন তোলা অসংগত হবে না। অনির্বাচিত ব্যক্তি দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী কাজ সহজে করা যায় বলে কি নির্বাচন হয় না? মূলত পাহাড়ি নেতৃত্বও ক্লান্ত। তারা নিজেদের আধুনিক, গণতান্ত্রিক যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বলেই এ পরিণতি।
এখানে নারী ধর্ষিত হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ে যায়। আঞ্চলিক দলগুলো প্রতিদিন মারামারি করে পরস্পরের নেতাকর্মীকে মেরে ফেলে। কোনো সরকার এর দায় স্বীকার করে না। পাহাড়ি ও বাঙালিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মূল সমস্যা চিহ্নিত না করে একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতি চলে। অথচ বিদ্রোহী দলগুলোকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে এখানে আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ হতে পারত। লাখ লাখ পাহাড়ি নিজেদের সংস্কৃতি উপস্থাপন করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেত। পাহাড়, গাছ, বাঁশ ও জুমকেন্দ্রিক জীবনকে সারা বাংলাদেশ আপন করে নিলে তো বহুজাতিক অস্তিত্ব স্বীকৃতি পেয়ে যায়। সবকিছু ভেস্তে গেছে। কারণ, এ দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি এখনও পরিপক্ব হয়নি। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিনটি উচ্চতর কমিটি গঠন করেছে। পাহাড়ের রাজনীতি কোন দিকে যাবে, সেটি বুঝতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে হয়তো।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ভেবেছি, পাহাড়েও গণতন্ত্রের দাবিতে নতুন রাজনীতি হবে। সেটি হয়নি। বলা যায়, এখানে নাগরিক আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর ক্ষুদ্র জাতিগুলো আরও কোণঠাসা হয়ে গেছে। সর্বোপরি অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে।
nউশ্যেপ্রু মারমা: সাবেক জনপ্রতিনিধি
usp8222@gmail.com
- বিষয় :
- প্রশাসন