রোগী এলেই ঘিরে ধরে দালাল
নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন নাটোর পৌর এলাকার হরিশপুর মহল্লার মৌমিতা দাশ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল থাইরয়েডের টি-এস-এইচ পরীক্ষা। হাসপাতালের কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারেন, এই পরীক্ষা হচ্ছে না। বাইরে থেকে করাতে হবে। বিষয়টি জানার পরপরই কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে ধরেন। জানান বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম। কোথায় পরীক্ষা করাবেন, সে পরামর্শও দেন তারা।
শুধু মৌমিতা নন, নাটোর জেনারেল হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এমন ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রতিদিনের রোগীরা। রিএজেন্ট না থাকায় হরমোন পরীক্ষা, থাইরয়েড প্রোফাইল, হার্টের ট্রপোনাইন, টি-এস-এইচ, এস-ইলেকট্রোলাইটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের পরীক্ষার তুলনায় বাইরে কয়েক গুণ টাকা দিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে রোগীদের। এ সুযোগে হাসপাতাল চত্বরে দালাল চক্রের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রোগী ও তাদের স্বজনদের।
সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় একদিকে রোগীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে গিয়ে সময় ও ভোগান্তি বাড়ছে। দ্রুত রিএজেন্ট সরবরাহ করে পরীক্ষা চালু করা এবং একই সঙ্গে হাসপাতাল চত্বরে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি না বাড়ালে এই ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিন নাটোর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের অনেককেই প্যাথলজি বিভাগ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ হাসপাতালের বাইরে পরীক্ষা করানোর জন্য ছোটাছুটি করছেন।
সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকার এক রোগীর স্বজন আরিফা বেগম বলেন, হাসপাতালে পরীক্ষার ফি কম হলেও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বাইরে গিয়ে তিন-চার গুণ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, টি-এস-এইচ পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা। একই পরীক্ষা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০০ টাকা। এফটি-৪ ও এফটি-৩ পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ফি ২০০ টাকা করে হলেও বাইরে দিতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। হার্টের ট্রপোনাইন পরীক্ষার হাসপাতাল ফি ৫০০ টাকা, বেসরকারি কেন্দ্রে তা এক হাজার ২০০ টাকা। এস-ইলেকট্রোলাইটের হাসপাতাল ফি ২৫০ টাকা হলেও বাইরে খরচ হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা।
সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালের শেষের দিকে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) থেকে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে হরমোন পরীক্ষার যন্ত্র পাঠানো হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যন্ত্রটির সঙ্গে দেওয়া রিএজেন্ট দিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর রিএজেন্ট সরবরাহের ওপর নির্ভর করে থেমে থেমে পরীক্ষা চলেছে। বর্তমানে এসব পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে ফিল্মের অভাবে প্রায় তিন মাস বন্ধ থাকার পর গত আগস্টে হাসপাতালের এক্স-রে পরীক্ষা আবার চালু হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
নাটোর জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, হরমোন পরীক্ষার ওই যন্ত্রে ৫০টিরও বেশি পরীক্ষা করা সম্ভব। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঁচটি পরীক্ষা করা হতো।
রিএজেন্ট না থাকায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেগুলোও বন্ধ রয়েছে। রোগী এলে অন্য জায়গা থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রিএজেন্ট পাওয়া গেলে আবার পরীক্ষা চালু করা সম্ভব হবে।
হাসপাতালের হিসাবরক্ষক সামসুন আরা বলেন, ২০২৩ সালে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল রয়েছে ১০০ শয্যার হাসপাতালের। প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ রোগী চিকিৎসা নেন। এই বিপুল রোগীর চাপের তুলনায় বরাদ্দ ও জনবল কম থাকায় হাসপাতাল পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে।
হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এএইচএম আনিছুজ্জামান পিয়াস বলেন, রোগীর সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য কিছু পরীক্ষা জরুরি হয়ে পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করতে গিয়ে রোগীরা জানতে পারেন হাসপাতালে পরীক্ষা হচ্ছে না। পরে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। এতে রোগীরা হয়রানির শিকার হন।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নাটোরের প্রায় ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা নাটোর জেনারেল হাসপাতাল। বন্ধ থাকা পরীক্ষা দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, অনেক সময় ল্যাব থেকে রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হয় এবং কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হবে, সেটিও বলে দেওয়া হয়। হাসপাতাল চত্বরে দালাল চক্রের তৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে নাটোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান বলেন, রিএজেন্ট টেন্ডারের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থায় হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়। চলতি অর্থবছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষের দিকে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ থাকা পরীক্ষা চালু করা হবে। দালাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতাল চত্বরে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। গত মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক আরও বলেন, ১০০ শয্যার জনবল ও বরাদ্দ দিয়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।