বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন মাত্রা
প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চার দিনের নয়াদিল্লি সফরে শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরেকবার প্রতিফলিত হতে দেখেছি আমরা। তাদের উপস্থিতিতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে স্বাক্ষরিত সাতটি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিপত্র এবং সেখান থেকে যৌথভাবে উদ্বোধন করা প্রকল্প তিনটিতেও 'উইন উইন' পরিস্থিতি স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন উচ্চতা বিশ্ববাসীর সামনে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ নরেন্দ্র মোদির এই বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য যে, দুই দেশের সম্পর্কের মূলমন্ত্র হচ্ছে উভয় দেশের নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন। আমরা প্রত্যাশা করব, প্রধামন্ত্রীর সদ্যসমাপ্ত নয়াদিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অস্বীকার করা যাবে না যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছলেও দ্বিপক্ষীয় কিছু ইস্যু এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আমরা যদিও স্থলসীমান্ত চিহ্নিতকরণ সম্পন্ন করতে পেরেছি, বারংবার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা এখনও বন্ধ হয়নি। আমরা যদিও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছি, তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু এখনও ঝুলে রয়েছে। এ সফরে প্রত্যাশা ছিল যে, তিস্তার পানি বণ্টনের প্রশ্নে ভারতের দিক থেকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নদীটির প্রশ্নে বাংলাদেশের দীর্ঘ অপেক্ষার কথা তুলেছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগের মতোই অভ্যন্তরীণ অংশীজনদের নিয়ে চুক্তিটি যত দ্রুত সম্ভব সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আমরা প্রত্যাশা করি, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের অবদান এবং বৃহত্তর বন্ধুত্বের প্রশ্নে ভারতের অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলো তিস্তার প্রশ্নে একমত হবে। বাংলাদেশ যে ভারতের জনসাধারণের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নে আন্তরিক সাড়া দিতে বিলম্ব করে না, ফেনীর নদীর প্রশ্নে সমঝোতা তার প্রমাণ। ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম শহরে খাবার পানি উত্তোলনের জন্য ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনে নয়াদিল্লির অনুরোধে ঢাকা আন্তরিক সাড়া দিয়েছে। আমরা দেখতে চাইব, তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত আন্তরিক সাড়া দেবে। আমরা আশান্বিত যে, আরও ছয়টি নদীর ক্ষেত্রে সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণে জোর দেওয়া হয়েছে আলোচ্য বৈঠকে। বস্তুত, যত দ্রুত সম্ভব অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে সমঝোতা সম্পন্ন করা উচিত। মনে রাখতে হবে, দুই দেশের মধ্যে আরও নতুন নতুন ইস্যু সামনে আসছে। বিশেষত আসামে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এর নেপথ্যে যে রাজনৈতিক খেলা রয়েছে, তা কেবল দুই দেশের সম্পর্ক নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। অবশ্য নয়াদিল্লি বরাবরই এটাকে 'অভ্যন্তরীণ' ব্যাপার বলে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে। আমরা মনে করি, এখন দুই দেশেরই উচিত সামনের দিকে তাকানো। দেশ ভাগের তিক্ত অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে অভিন্ন ভূগোল, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধির সোপান হিসেবে কাজে লাগানো। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পথ দেখাচ্ছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার উচিত হবে সেই পথ অনুসরণ করা।
