ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রিজার্ভের নিম্নগামিতা রুখতে হবে

অর্থনীতি

রিজার্ভের নিম্নগামিতা রুখতে হবে

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:৪৯ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০৫

সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। আমরা নৌকা ফুটো হওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছি বহু আগেই, তবে মেরামতের দিকে মোটেও নজর দেওয়া হয়নি– সমস্যা ওখানেই। ইদানীং নিম্নমুখী রিজার্ভ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের দাম উদ্বেগের উৎস হয়ে উঠছে; চায়ের কাপে ঝড় উঠছে এবং গুজবের জন্ম হয়ে ডালাপালা বিস্তৃত হচ্ছে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিনা পূর্বাভাসে সংঘটিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিল। খাদ্যসামগ্রী, বিশেষত গম ও সার আমদানিতে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশ পড়ল বিপাকে। একদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে পতন হুহু করে বেড়ে ওঠা মূল্যস্ফীতির আগুনে জ্বালানি দিল; অন্যদিকে দ্রুত পতন ঘটতে লাগল রিজার্ভের। এর মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে সংলাপ শেষে শর্তযুক্ত ঋণপ্রাপ্তি পরিস্থিতি খাদের কিনারে যেতে দেয়নি– এই যা রক্ষা।

বাংলাদেশকে এখন দারুণ চিন্তায় ফেলেছে অনেক কিছু। তবে সব ছাপিয়ে এখন ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ধস ও রিজার্ভের পতন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যারা বলছেন আমরা খুব ভালো আছি, সবকিছু ভালো চলছে, তারা যেমন ঠিক নন; তেমনি যারা গেল গেল রব তুলছেন, তারাও ঠিক নন। বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেদিকে নজর দেওয়া হবে এই মুহূর্তের সহি কাজ। ডুবন্ত মানুষকে আগে উদ্ধার এবং পরে বকাবকি করা হবে বুদ্ধিমানের দৃষ্টিভঙ্গি।

২০২১ সালের আগস্ট মাসের ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অবশ্য ইডিএফ ফান্ডের আট বিলিয়ন বাদ দিলে রিজার্ভ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে, যা উদীয়মান চ্যালেঞ্জের দিকে আঙুল তোলে।


যে কোনো দেশে রিজার্ভ অনেকটা বাড়ির ছাদে রাখা পানির ট্যাঙ্ক কিংবা চৌবাচ্চার মতো। একদিক দিয়ে পানি প্রবেশ করবে, অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে সেই পানি প্রাপকের চাহিদা পূরণ করবে। ঠিক যে হারে পানি বের হবে, সেই হারে পানি প্রবেশ করলে ভারসাম্য অবস্থা বজায় থাকে; নচেৎ হয় পানি উপচে পড়ে অপচয় ঘটাবে অথবা বাসিন্দারা পানিবঞ্চিত হবে। পানি যেমন মানুষের জীবন; রিজার্ভও তেমনি একটি অর্থনীতির প্রাণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাটি সচল রাখতে যেসব মালমসলা দরকার, তার সিংহভাগ আসে বিদেশ থেকে এবং তা কিনতে হয় বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। সুতরাং, বৈদেশিক মুদ্রা মজুত না থাকলে (অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমতুল্য) অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি হতে পারে (যেমন অধুনা শ্রীলঙ্কায়)। অন্যদিকে অতিরিক্ত রিজার্ভও যে অর্থনীতিকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, সে বিষয়ে আপাতত দৃষ্টি নাইবা দেওয়া হলো।

ডলার তথা রিজার্ভের দ্রুত পতন ঘটছে কেন? এর আগে, বিশেষ করে গেল দুই দশকে কেন এমন পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়নি? সোজা কথায় এর উত্তর হচ্ছে, যে হারে চৌবাচ্চার পানি ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চেয়ে কম হারে চৌবাচ্চায় পানি প্রবেশ করছে। হুন্ডির কারণে ইনফরমাল চ্যানেলে বিদেশ থেকে পাঠানো ডলার দেশে ঢুকছে ঠিকই, তবে ব্যাংকে জমা হচ্ছে না। হুন্ডিতে ডলারের দাম সরকারি রেটের চেয়ে অনেক বেশি, ডলারপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ডলার এলে দেওয়া হবে ১০০ টাকা; প্রেরক যদি হুন্ডির দ্বারস্থ হয়, তাহলে সে পাবে ১০৭ থেকে ১১০ টাকা। সুতরাং, যতদিন হুন্ডি ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকবে, ততদিন সরকারি পাতে ডলার পড়বে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের রপ্তানি আয়ও পড়ন্ত, যার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের মতো স্ফীত হচ্ছে না। দুই, আমদানি ব্যয় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, হোক সে যুদ্ধের কারণে কিংবা টাকার মান নিচে নামার কারণে। সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যে যথাযথ কাজ করেনি, সে বিষয়ে সমালোচনা আছে এবং অভিযোগ আছে যে, ওইসব পদক্ষেপ কার্যকর হয়ে থাকলেও তা কাঁচামাল কিংবা পুঁজি পণ্যপ্রবাহ ব্যাহত করে রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আবার শুনছি, সরকারি কর্মচারীদের জন্য কয়েকশ গাড়ি আমদানির প্রস্তাব উঠেছে। তা ছাড়া এই সংকটকালেও তো দেখা যাচ্ছে অযাচিত বিদেশ ভ্রমণ, বিলাস জাতীয় পণ্য আমদানি বাড়ছে বৈ কমছে না। বিভিন্ন ছুতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ আগের মতোই চলছে। এ ধরনের বিলাসজাত পণ্য আমদানি এবং ‘আনন্দ সফর’ এমনকি ব্যক্তি খাতের; তা নিরুৎসাহিত করে ডলার সাশ্রয় করা উচিত ছিল। তিন, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার বিদেশে রাখা এবং বিশেষত নির্বাচনের আগে বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি ডলার সংকট সৃষ্টির পেছনে নিয়ামক হিসেবে শুধু কাজ করেছে বলে মনে হয় না, তা শুধু চলমান পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রিজার্ভ যেন ১৫ বিলিয়নের নিচে না নামে এবং ১০ বিলিয়ন মানে লাল বাতির সংকেত। তবে যদি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো তাৎক্ষণিক বিবেচনা করা যায়, তাহলে বোধ হয় পরিস্থিতি তেমন নাজুক না-ও হতে পারে: ক. ডলারের বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ করে দেওয়া, খ. বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পাইপলাইনে থাকা সাহায্য বা অনুদান দ্রুত অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করা, (গ) ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের অন্তর্মুখী প্রবাহ বাড়ানো, (ঘ) পণ্যের বহুমুখিতার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কড়া নজরদারিতে আমদানি-রপ্তানি অব্যাহত রাখা, যাতে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং না হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানোর কৌশল সন্ধান করা।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফে এর ইতিবাচক প্রাক্কলন এবং ভালো ফলনের জন্য আগামী আমন ফসল পর্যন্ত হয়তো চাল আমদানি করা লাগবে না– এমন সংবাদ আশার বাণী বয়ে আনে বৈ কি। এর বিপরীতে সদ্য শুরু হওয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও নাজুকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সুতরাং, ‘মুখে শেখ ফরিদ, বগলে ইট’ জাতীয় নীতি গ্রহণ না করে প্রকৃত অর্থে ডলার রেটে বাজারভিত্তিক একটি সমাধান এবং মুদ্রা পাচার রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংকট সমাধানে সাহায্য করতে পারে। নতুবা ঝ-তে ঝড় ওই এলো তেড়ে…! আব্দুল বায়েস: অর্থনীতিবিদ; প্রাক্তন উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×