ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচন নিয়ে সংশয় কেন

রাজনীতি

নির্বাচন নিয়ে সংশয় কেন

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:৪৬ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০৫

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের সবখানে এখন একই আলোচনা– নির্বাচন কি হবে; হলেও তা কেমন হবে; বিরোধী দল কি নির্বাচনে আসবে; না এলে তা কি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে– এমন আরও কত! কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলোচনার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আশঙ্কাও– নির্বাচন না হয়ে অতীতের মতো ১/১১-এর পুনরাবৃত্তি কিংবা জরুরি অবস্থার দিকে দেশ ধাবিত হবে না তো! মানুষের এসব আলোচনা, আশঙ্কা যে একেবারেই কারণহীন, এমনটি কিন্তু নয়। সাধারণত নির্বাচন এলে মানুষ কাকে ভোট দেবে, কাকে দেবে না– এসব নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা। তা না হয়ে চলছে খোদ নির্বাচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে জল্পনাকল্পনা; সঙ্গে যোগ হচ্ছে নানা গুজব। এর পেছনে অবশ্য কারণও রয়েছে।

গত দুটি নির্বাচন (২০১৪ ও ’১৮) দেশের মানুষের মন থেকে স্বাভাবিকতার প্রায় সব অনুষঙ্গই মুছে দিয়েছে। কাউকে, কোনো কিছুকেই মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। বিশেষ করে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে– এ জিনিসটাই এখন আর কেউ ভাবতে পারে না। এ বাস্তবতায় বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, সিপিবি-বাসদসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আহূত আলোচনাতেও তারা অংশগ্রহণ করেনি। প্রায় দুই বছর ধরেই তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে আসছে। এদিকে সরকারও পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকছে। যখনই বিরোধী দল কোনো কর্মসূচির ডাক দিচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি দল শান্তি সমাবেশের নামে রাজপথে থাকছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় আরও বাড়ছে।

তবে এটাও সত্যি, ২০১৪ ও ’১৮ সালের নির্বাচনসহ নানা রাজনৈতিক কারণে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও বিরোধী দল সেসব ইস্যুতে দেশে বড় কোনো গণআন্দোলনের আবহ তৈরি করতে পারেনি। এর পেছনে সরকারের কঠিন অবস্থান যেমন কাজ করছে, তেমনি রয়েছে বিরোধী দল বা দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও। অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ পরিকল্পনা বা স্ট্র‍্যাটেজির অভাবে বিরোধী দল সাধারণ মানুষকে আন্দোলনমুখী করতে পারছে না। ফলে সব ক্ষোভ, হতাশা চায়ের টেবিলেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, সিপিবি, বাম জোটসহ মাঠের অন্যান্য বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে কী হবে? সরকারই বা কী করবে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সরকার যে কোনো মূল্যে নির্বাচন করে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচনে কে এলো, আর কে এলো না, তা নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয়। প্রয়োজনে কিংস পার্টি গঠন করে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক চেহারা দেওয়ার একটা চেষ্টা করবে। সম্প্রতি তৃণমূল বিএনপি নামে যে একটি দলের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, বিশ্লেষকরা তাকে সরকারের কিংস পার্টি তৈরির অংশ হিসেবে দেখছেন। এ ক্ষেত্রে সরকার সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করবে বলেই মনে হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তায় ভয়াবহ রকম ভাটা পড়েছে। যার ফলে জনমনে আওয়ামী লীগবিরোধী মনোভাব বেশ প্রবল হয়ে উঠেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল এটাকে কাজে লাগাতে চাইবে। কিন্তু  আওয়ামী লীগ এ কথা ভালোভাবেই জানে, যদি কোনো কারণে তাকে ক্ষমতা হারাতে হয় তাহলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। এ কথা দলটির অনেক নেতা অনেকবার প্রকাশ্যেই বলেছেন। তাই সে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেবে না– ভেতরে বা বাইরের শক্তি যে যা-ই বলুক আর করুক না কেন। সে কারণেই সে চাইবে তার নিয়ন্ত্রণে রেখেই নির্বাচন করতে। কোনো অবস্থাতেই তদারকি সরকারের দাবি সে মানবে না।

অন্যদিকে বিএনপি বিশাল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন করে সরকার হটানোর অবস্থায় নেই। সে কারণে তারা নির্বাচন বয়কট করতে পারবে কিন্তু ভণ্ডুল করতে পারবে না। তবে এ কথাও ঠিক, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় যতই টান পড়ুক না কেন, সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার মতো শক্তি ও সাংগঠনিক অবস্থা কোনো রাজনৈতিক দলেরই নেই। আওয়ামী লীগ সেই সুযোগটাই নেবে। যদিও এখন পর্যন্ত নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়নি, সরকারি দল পুরো উদ্যমে নির্বাচনী প্রচারে নেমে গেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সভায় সরাসরি দলীয় প্রতীক নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। দলের বিভিন্ন নেতা এবং সংসদ সদস্যও নিজ নিজ এলাকায় ভোটারদের কাছে যাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। দুর্গাপূজা সামনে রেখে অনেক এলাকায় পূজামণ্ডপে অনুদান দেওয়া শুরু করেছেন। তবে গত ১৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘নির্বাচন আদৌ হবে কিনা তা বলতে পারছি না।’ এ যেন সাধারণ আমজনতারই কথা।

এদিকে অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় আগামী নির্বাচন ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা বাংলাদেশের ওপর অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। অবস্থাটা এমন যে, গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পিটার হাস, ডোনাল্ড লু– এসব নামের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়; ভারত এবং চীনও এ খেলায় অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত। অবস্থাটা এমনই যে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত, চীন ও আমেরিকার খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। সবাই নিজের মতো করে পরিস্থিতিকে পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। তার মানে এই নয়, এরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর নির্বাচন নিয়ে খুবই উৎসাহী।

আসলে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে এই তিনটি দেশ প্রতিযোগিতা করছে। সবাই নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশকে পাশে দেখতে চায়। আমেরিকা চায় বাংলাদেশকে চীন থেকে দূরে রাখতে; চীনও চায় আমেরিকার প্রভাব খর্ব করতে। আর ভারত তো চারদিক থেকেই বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। কাঁচামরিচ থেকে ডিম, তিস্তা থেকে ট্রানজিট– সবকিছুই ভারতের নিয়ন্ত্রণে। সেও কিছুতেই তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। এদের সবারই লক্ষ্য বাংলাদেশে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করা, যার ফলে তাদের স্বার্থ রক্ষা হয়। দেখার বিষয় এটাই যে, ক্ষমতাসীন দল ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের দাবিদার এই তিন শক্তিকে কীভাবে ম্যানেজ করে। যদিও ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘তলে তলে’ সব ‘আপস’ হয়ে গেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সবকিছু প্রকাশ্য না হবে ততক্ষণ জনমনের সংশয় আর শঙ্কা কাটবে না। মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×