অধ্যক্ষ বড় বাঁচা বেঁচেছেন...

রাজশাহী পলিটেকনিক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯

মাহফুজুর রহমান মানিক

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বড় বাঁচা বেঁচেছেন। সাঁতার জানায় তিনি প্রাণে বেঁচেছেন, এটা তার সৌভাগ্য। কিন্তু এ বাঁচা তো আসলে 'বাঁচা' নয়। একজন শিক্ষক হিসেবে তার জন্য এর চেয়ে বড় অপমানের বিষয় আর কী হতে পারে। তারই শিক্ষার্থী দ্বারা তিনি নিগৃহীত হয়েছেন। আসলে এটি তার নয়, আমাদেরই অপমান। লজ্জায় আমাদের মাথা নুইয়ে আসে। এ সমাজ বরাবরই শিক্ষকের সম্মান বজায় রাখতে ব্যর্থ। পুলিশের হাতে শিক্ষক মার খান রাজপথে, ক্যাম্পাসে ছাত্রের হাত থেকেও নিস্তার নেই! আমরা দেখেছি, এ বছরেরই মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে বাধা দেওয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মাসুদুর রহমান। এভাবে উদাহরণের শেষ নেই। রাজশাহীর ঘটনাটি এরই যেন পুনরাবৃত্তি।

রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষকে যেভাবে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী টেনেহিঁচড়ে পুকুরে ফেলেছে, তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে আমরা হতবাক হয়েছি। কতটা বেপরোয়া হলে অন্যায় আবদারের কাছে নতিস্বীকার না করায় একজন শিক্ষকের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক আচরণ করা সম্ভব? ঘটনাটি যে কারণে ঘটেছে, তাতে আমাদের বিস্ময় আরও বেড়েছে। একজন অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন। সঙ্গত কারণেই অধ্যক্ষ শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপস্থিতি না থাকায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দিয়ে তাদের অভিভাবকসহ বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সংবাদমাধ্যমসূত্রে আমরা জেনেছি, ঘটনার দিন (২ নভেম্বর) সকালে তাদের মধ্যে অন্যতম কামাল হোসেন সৌরভ, যিনি মিডটার্ম পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন এবং শ্রেণিকক্ষেও তার প্রয়োজনীয় উপস্থিতি নেই। তবে তার পরিচয় তিনি রাজশাহী পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক। এ কারণে নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখান। তারপরও অধ্যক্ষ তাদের অভিভাবককে নিয়ে বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু এর বিপরীতে তারা উচ্চস্বরে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যান। এরই জের ধরে সেদিন তিনি যখন দুপুরে নামাজ পড়ে অফিসে যান, পথে ছাত্রলীগ নেতা সৌরভ ও তার সহযোগীরা তাকে টেনেহিঁচড়ে চ্যাংদোলা করে পুকুরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনাটি পানিতে ফেলার হলেও সামাজিক অপরাধের দিক থেকে এটি গুরুতর এবং জঘন্যতম। জানি না, প্রচলিত আইনে এটি খুব বড় অপরাধ কি-না; যদিও এ ঘটনায় অধ্যক্ষ মামলা করেছেন। একে সাদামাটাভাবে নিলে চলবে না। ঘটনার ইনটেনশন অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি বলছে, অধ্যক্ষের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। কারণ, পুকুরের গভীরতা অন্তত ১৫ ফুট। সাঁতার না জানলে এ গভীরতায় কেউ পড়লে ডুবে মরে যাওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক ছিল। সুতরাং মৃত্যুচেষ্টাকেই মামলার মোটিভ হিসেবে সামনে নিতে হবে। মঙ্গলবার সমকালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত কামাল হোসেন সৌরভকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমরা চাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হোক।

সৌরভরা কেন এতটা বেপরোয়া হয়? আমরা জানি না, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এটা ভাবেন কিনা যে, তারা যত অপকর্মই করুক, দল তাদের রক্ষা করবে কিংবা তারা ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে। বুয়েটের আবরার হত্যাকাণ্ডেও জড়িতরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। রাজশাহী পলিটেকনিকের এ ঘটনায়ও অভিযুক্ত ছাত্রলীগ। আমরা দেখেছি, ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্র সংগঠনটি প্রায় এক দশক তার অপকর্মের জন্যই সংবাদমাধ্যমে প্রধানত খবর হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর ছাত্রলীগ থেকে সংশ্নিষ্ট নেতাকে বহিস্কার করা হয়, এটা সত্য। তারপরও ছাত্রলীগের অপকর্ম কেন কমছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা মনে করি, ছাত্রলীগেও পরিশুদ্ধি অভিযান দরকার। সারাদেশে ছাত্রলীগের সব পর্যায়ের শাখা-উপশাখার নেতাকর্মীদের কঠোরভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন, তারা যেন কোনো ধরনের অপকর্মে না জড়ায়। অপকর্ম করলে তার দায় দল তো নেবেই না, উল্টো শাস্তি ভোগ করতে হবে। দলের ভাবমূর্তি রক্ষার্থেই এটি জরুরি।

আমরা সংবাদমাধ্যমে জেনেছি, রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ছাত্রলীগের বিরোধ ২০১৭ সালে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও অন্যান্য সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এ বিরোধ। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তিনি, অভিভাবকও তিনি; তার কাছেই সব নিয়ন্ত্রণ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সেখানে ছাত্র সংগঠন কেন নাক গলাবে? বাস্তবে কিন্তু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তা-ই হচ্ছে। সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনই ছাত্রাবাসের সিটসহ অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছে। সেখানে তাদের কাছে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বড়ই অসহায়। যারা ছাত্রনেতাদের অন্যায় আবদার মেনে নিতে পারছেন, তারা বহাল তবিয়তে থাকছেন। আর অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের মতো যারা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাথা নোয়ান না, তারা নিগৃহীত হয়েছেন বা হচ্ছেন; ঠিক যেভাবে পরীক্ষায় অসদুপায় ঠেকাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন শিক্ষক মাসুদুর রহমান। আমরা মনে করি, এ অধ্যক্ষের মতো শিক্ষকদের বের করে পুরস্কৃত করা দরকার।

অবাক কাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের মতোই রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে রয়েছে ছাত্রলীগের টর্চার সেল! সেখানে ১১১৯ নম্বর কক্ষে অবস্থিত টর্চার সেলে বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমরা বিস্মিত হই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়, যারা বলা চলে শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোরে পা দিয়েছে। এ বয়সেই তারা এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে কীভাবে! বিশেষ করে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পলিটেকনিকে ছাত্র রাজনীতি কতটা জরুরি, ভাবা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়েও লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা নিয়ে কথা উঠছে। শিক্ষার স্বার্থেই এটা জরুরি। তা না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।

আমরা মুখে মুখে বলি, শিক্ষকরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকসমাজ। শিক্ষকদের সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত বললেও তাদের বাস্তব অবস্থা তো আমরা দেখছিই। রাজশাহী পলিটেকনিকে অধ্যক্ষ লাঞ্ছনার ঘটনায় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'বাদশাহ আলমগীরের পুত্র সম্মান করে, তার শিক্ষকের পা ধুয়ে দিয়েছিলেন। আর ছাত্রলীগ শিক্ষককে সম্মান করে পুকুরে ফেলে একেবারে গোসল করিয়ে দিয়েছে।' জাতি হিসেবে এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখি! আমাদের ক্ষমা করবেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ স্যার।

mahfuz.manik@gmail.com

সাংবাদিক