বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে উদ্ভাবনী হতে হবে

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২০     আপডেট: ২০ জুন ২০২০

ড. খুরশিদ আলম ও সুলতান মাহমুদ

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা সংকট। বিশ্বমন্দায় অর্থনীতি, আমদানি এবং রপ্তানিতে স্থবিরতা, দেশীয় উৎপাদন এবং প্রবাসী আয়-উপার্জনে ধস, কর্মসংস্থানের অভাব, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বাজেট তৈরি করা কঠিন এবং সেই লক্ষ্য অর্জন করা সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজস্ব আয়

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৮০০০ কোটি টাকা যেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আসবে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কর্তৃপক্ষের পক্ষে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কারণ চলতি অর্থবছরে এনবিআরের যে নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল, সেখানে ৫ থেকে ২০ শতাংশ কম হয়েছে। এ বছর আরও করদাতাকে করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করা হয়েছে যা অবশ্য প্রত্যাশিত ছিল এবং অনেকের দাবি ছিল আরও বেশি করার। বিআইএসআর থেকে বলা হচ্ছে- সরকার আয় করে না কারণ তারা ব্যয় করতে পারে না। কিন্তু বর্তমান বছরে সরকারের ব্যয় করার চেয়ে আয় করা অন্য যে কোনো বছরের চেয়ে কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য খাত

সবাই ধারণা করেছিলেন যে, স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে যা জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ এক ভাগেরও কম; আর মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। চলতি বছরের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে আসন্ন অর্থবছরে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে মাত্র। মূলত এটা বাড়েনি। সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেল্গক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য পরিষেবা বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারত। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের যে বেহাল দশা, সে তুলনায় এ বাজেট কোনোভাবেই মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে না।

কৃষি

কৃষিই আমাদের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ করোনাজনিত আর্থিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে। প্রস্তাবিত বাজেটে আনুপাতিক হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে যা চলতি বছর ছিল মোট বাজেটের ৪ শতাংশের কম। ধান-চালের বাইরে অন্যান্য খাত যেমন গবাদি পশু পালন, শাকসবজি উৎপাদন ও পোলট্রিতেও অসুবিধা রয়ে গেছে।

ঘরে খাবার থাকলে বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো দুর্যোগ সহজে মোকাবিলা করতে পারে। এ জন্য কৃষিজ উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। এ ছাড়া যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে কৃষি সংশ্লিষ্ট যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য ঋণ প্রদানকে আরও সহজলভ্য করা যেতে পারে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের জন্য কৃষি বীমাকে সহজলভ্য করে চালু করা যেতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এবারের বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, এটা বেশ আশাব্যঞ্জক। মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে প্রস্তাব করা হয়েছে। কারণ অনেক মানুষকে বেশ কিছুদিন সহায়তা প্রদান করতে হবে। দারিদ্র্য নিরসনের কথা মাথায় রেখে আরও বাড়ানো যেতে পারত। সামাজিক নিরাপত্তার একটা বড় অংশ ব্যয় হয় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের জন্য। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুষম বণ্টন এবং যথাযথ বাস্তবায়ন হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং গবেষণা খাত

চলতি অর্থবছরের মতো আসন্ন অর্থবছরেও শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে (১৫.১%) প্রত্যাশিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে; কিন্তু গবেষণা খাত (প্রায় .০২%) বরাবরের মতো উপেক্ষিত থেকেছে। কৃষিতে অনেক গবেষণা হওয়ার ফলে বাংলাদেশ কৃষিতে উন্নতি করছে। এক্ষেত্রে অন্যান্য সেক্টর যেমন- শিল্প, স্বাস্থ্য, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গবেষণা নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে গবেষণা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষণার কোনো নীতিমালা নেই।

করোনা প্রণোদনা প্যাকেজ

আসন্ন অর্থবছরে করোনা প্রণোদনা প্যাকেজে বরাদ্দ ধরা হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকা যা কর্মসংস্থান এবং অর্থনেতিক পুনরুদ্ধারে ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার জন্য; কিন্তু কীভাবে করা হবে সে বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। করোনা প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য অর্জনে যথাযথ বাস্তবায়ন হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এটি যদি বিশেষ শ্রেণির ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়, তাহলে দেশ এক মহাসংকটে পড়বে।

অন্যান্য খাত

পোশাক রপ্তানি, জনশক্তি রপ্তানি, শেয়ারবাজার ধস, রেমিট্যান্সসহ আমদানি-রপ্তানিতে স্থবিরতা, পরিবেশ রক্ষা, সুন্দরবনের সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা আসন্ন বাজেটে আরও বেশি গুরুত্ব পেতে পারত। করোনা মহামারির মতো পরিস্থিতিতে, বিশ্বমন্দার অর্থনীতিতে এই বাজেট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারত বলে মনে করি। ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এবং বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আগের তুলনায় বহুগুণে উদ্ভাবনী হতে হবে, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং তদারকি বাড়াতে হবে, সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে সুসমন্বিত সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

পণ্যের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি

প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু পণ্যের মূল্য কমানো এবং বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে ইন্টারনেটের খরচ ও মোবাইল ফোনের খরচ বাড়ানো বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত নয়। বিআইএসআরের বার্ষিক পর্যালোচনা ২০১৯-এ দেখানো হয়েছে- তরুণদের একটি বিশাল অংশ ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন পেশায় কর্মসংস্থান করেছে এবং উল্লেখযোগ্য হারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ফলে, ইন্টারনেটকে আরও সহজলভ্য করার জন্য বরং খরচ কমানো প্রয়োজন যেন পল্লি অঞ্চলেও মানুষ সহজে ব্যবহার করতে পারে।

অপচয় রোধ

বিআইএসআর বহুদিন ধরে বলে আসছে, সরকারকে অপচয় রোধে মনোযোগ দেওয়া দরকার। বিভিন্ন সেক্টরে প্রচুর অপচয় হচ্ছে, অনেক কাজ আরও কম খরচে করা সম্ভব। এ বিষয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই। অপচয় রোধ করার জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং সেল/কমিটি করে দেওয়া দরকার। বরাদ্দগুলো ভালোভাবে যাচাই করার একটি বিধান রাখা দরকার। অপচয় কমলে, দুর্নীতিও কমবে।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট এবং একই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কর্মকর্তা (অর্থনীতি ডিভিশন)