ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংস্কারে বৃত্তাবদ্ধ বাঙালি

সংস্কৃতি

সংস্কারে বৃত্তাবদ্ধ বাঙালি

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২১ | ১৮:১২ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২১ | ২০:২৮

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ৬৯ বছর পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের মোহন মুহূর্তগুলোতে এসে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে উচ্চবাক থেকেও শঙ্কিত বোধ করি বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে এখনও অনেকের মনে কুসংস্কার দেখে। এখনও যেন অনেকেই টিপ পরাকে হিন্দুয়ানি মনে করেন এবং বাঙালির চিরকালের প্রশংসিত পোশাক শাড়ি এখন তারা প্রায় পরিত্যাগ করতে বসেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রো-ডলার উপার্জন করতে গিয়ে তাদের কাছে আরাধ্য হয়ে গেছে আরব্য সংস্কৃতি। আরব্য রজনীর সেই এক হাজার একটি চোখ ঝলসানো রাতে তারা আবদ্ধ হয়ে গেছেন। অথবা তারা আটকে আছেন বলিউডের সেই ধুমধাড়াক্কা চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর মধ্যে, যাদের পোশাক পাকিস্তানিদের যতটা কাছে, বাঙালির পোশাকের চেয়ে ততোধিক দূরে। পরিহাসের বিষয়, এক শ্রেণির মানুষ নানা অজুহাতে ভারতকে নিয়ে অহরহ নেতিবাচক কথা বলেন, গালাগাল করেন। কিন্তু তারাই ভারতীয় হিন্দি ছবি দেখেন এবং তাতে এত বেশি সংক্রমিত হন; নিজেদের জীবনধারা পাল্টে ফেলেন নির্দি্বধায়। কোনো দেশের চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে আমার কোনো বিরাগ নেই। আমি বরং অনুরাগী সেই দেশের চলচ্চিত্রেরও, যেখানে বাঙালি পেয়েছে সত্যজিৎ রায় কিংবা মৃণাল সেনের মতো পরিচালকদের, যাদের নির্মাণশৈলীতে আমরা ঋদ্ধ হই অনায়াসে। কিন্তু যে সংস্কৃতি আমার থেকে অনেক দূরে; কাছে বরং তাদের, যাদের বিরুদ্ধে বাঙালি অস্ত্র ধরেছিল একাত্তরে। সেই সংস্কৃতির আবর্তে ঘুরপাক খাবে বাঙালি- সেটা মেনে নিতে পারছি না।

আরেকটি বিষয় আমাদের মর্মপীড়ার কারণ হওয়া উচিত। তা হলো সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়ে ফেলা। একাত্তরের আগে পাকিস্তানিরা বাঙালির ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতিকে হিন্দুদের ভাষা ও সংস্কৃতি বলে মৌলবাদীদের উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফলও হয়েছিল। তবে পাকিস্তানের শাসনকালে নয়, এর বহু আগেও কোনো কোনো বাঙালি মুসলমান এমন কথাও বলার চেষ্টা করেছেন- আমরা বাঙালি হলে আর মুসলমান থাকব না। ১৯০৩ সালে নব নূর পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, 'বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা। সুতরাং হিন্দুরাই যে বঙ্গসাহিত্য চর্চায় অগ্রগণ্য ও প্রধান ইহা কিছুই অস্বাভাবিক নহে।' কাজেই বোঝা যায়, তখনকার মুসলিম গোঁড়া সমাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার চার দেয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। তবে এর জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৎকালীন বাঙালি হিন্দুরাও দায়ী ছিলেন, যারা এটা মেনে নিতে রাজি হননি যে মুসলমানরাও বাঙালি। পরিহাসের বিষয়, এই দৃষ্টিভঙ্গি কট্টর মুসলমানদের পক্ষেই গিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলমানরা বুঝতে শিখলেন- ধর্ম ও সংস্কৃতি ভিন্ন বিষয়। সংস্কৃতির কেবল সেই অংশটিই ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যাকে আমরা ধর্মাচার বলি।

সংস্কৃতির বিশাল অংশটির সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বৃক্ষের মতো সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে সংশ্নিষ্ট অঞ্চলের আলো-হাওয়ায় মুক্ত বাতাসে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতো মনীষীরা বুঝেছিলেন এই মৌলিক পার্থক্যটা। আর তাই এই নমস্য পণ্ডিত সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ছিলেন বাঙালি। বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া বাঞ্ছনীয়- পাকিস্তান হওয়ার আগেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ এ নিয়ে পত্রিকায় লিখেছিলেন এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ যখন বলেন- উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত, তখন ড. শহীদুল্লাহ্‌ এর প্রতিবাদ করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাঙালিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি- তারা বাঙালি, নাকি মুসলমান, নাকি হিন্দু? এই জিজ্ঞাসাটি তখন থেকে অবান্তর হয়ে যায়। কারণ, আমরা খুঁজে পাই আমাদের শিকড়ের সন্ধান। তবুও কিছু মানুষ এই তর্কটাকে জিইয়ে রাখে। যে কারণে আমরা লক্ষ্য করি ১৯৭১ সালে রাজাকার-আলবদরদের উত্থান, যাদের উত্তরপুরুষরা এখনও চোরাগলিতে বিচরণ করে। রাজনীতির মঞ্চ থেকে দূরে সরে গেলেও এরা এখন সমাজের বিভিন্ন স্থানে ঘাপটি মেরে রয়েছে। আর এই পাকিস্তানপন্থিদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যফেরত কিছু নিরীহ মানুষ, যারা বিত্তের পরিবর্তনের সঙ্গে চিত্তেরও পরিবর্তন নিয়ে আসছেন। তারা পাকিস্তানপন্থি নন, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি তাদের কারও কারও মস্তিস্ক ধোলাই করে দিয়েছে। যেখানে লুঙ্গি-পাঞ্জাবিই ছিল গ্রামের সহজ-সরল মানুষের সাদামাটা পোশাক; এখন তাতে এসেছে পরিবর্তন। হাওয়ার দেশের পোশাকের প্রাধান্যে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি মুসলমান পুরুষের চিরন্তন পোশাক। বাঙালি হিন্দুও এখন আর ধুতি পরছেন না।

লক্ষণীয়, পুরুষের পোশাকের চাইতেও বড় রকমের পরিবর্তন এসেছে বাঙালি মেয়েদের পোশাকে। বিশেষত শহরের অনেক মেয়ের পোশাক দেখলে আজকাল আর মনে হয় না, আমরা বাংলাদেশে আছি। হিজাবের কথা নাই বা বললাম। হিজাব এখন অনেকটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মুসলিম মেয়েদের পোশাকের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতটাই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে হিজাব; পশ্চিমের এই দেশেও শিক্ষিত কর্মজীবী অনেক মুসলিম নারীকে হিজাব পরতে দেখি। তার সঙ্গে থাকে ম্যাচ করা আনুষঙ্গিক পোশাকও। পশ্চিমে হিজাব পরার বিষয়টি মেনে নিচ্ছেন অনেকেই আত্মপরিচিতি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে। বিশেষত ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে কারণে-অকারণে ইসলামোফোবিয়া অর্থাৎ ইসলামভীতি ছড়িয়ে পড়া শুরু করে পশ্চিমের জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তার প্রতিবাদস্বরূপ মুসলিম নারীরা হিজাব পরে নিজের পরিচিতি তুলে ধরেও প্রমাণ করছেন- তারা সন্ত্রাসী নন কোনোক্রমেই। সে জন্যই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা এই হিজাব পশ্চিমের নারীদের পরার পেছনে যুক্তি আছে বৈকি। আমাদের মা-খালাদের কখনোই দেখিনি হিজাব পরতে। তাদের মা-খালারাও হিজাব পরেননি। শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে রাখাটাই ছিল তাদের সংস্কৃতির অংশ।

হিজাব বিষয়ে এক ধরনের ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। কিন্তু শাড়ি পরিত্যাগের কোনো যথার্থ কারণ খুঁজে পাই না। কেবল তরুণীরা নন, বয়স্করাও এখন আরবি পোশাক পরে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ান। একটা সময় ছিল, যখন স্টু্কলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে গেলেই মেয়েরা শাড়ি পরতেন। তারপর এলো সালোয়ার-কামিজের চল। চলাফেরার সুবিধার জন্য সেটা মেনে নিলেও অনুষ্ঠান আয়োজনে শাড়ির চল প্রায় উঠতে বসেছে। এখন লেহেঙ্গার সঙ্গে নানারকম পোশাক তারা পরছেন হিন্দি সিনেমা ও সংস্কৃতির অনুকরণে। এমনকি বাংলাদেশে এখন ক্রমেই বিয়ের পোশাক হিসেবে শাড়ি বাদ পড়ে গেছে। সেখানেও যেন বলিউডের ছায়াছবির অনুকরণ। আর বাঙালি নারীর কপালের টিপ এখন তো আর পহেলা বৈশাখ ছাড়া দেখাই যায় না। কারণ, মস্তিস্ক ধোলাইকারীরা বলছেন, টিপ নাকি হিন্দুয়ানি ব্যাপার। কিন্তু তারাই যখন পাশ্চাত্যের উগ্র প্রসাধনী পরছেন, তখন তা কতখানি ইসলামসম্মত, তা জিজ্ঞাস্য বটে। টিপ তো একটি প্রসাধনই কেবল। এটি পরিধান করলেই নারী দেবী হয়ে যান না। বাঙালি সংস্কৃতির এই বিপর্যয় স্বাধীনতার এত বছর পরও আমাদের লজ্জিত করে। এখন প্রয়োজন একুশের ভাষা আন্দোলনের মতো সামাজিক আন্দোলন, যেখানে আমাদের পরিত্যাজ্য এসব অদ্ভুত অবাঙালি  পোশাক, যা আমাদের স্বাধীন সত্তাকে খর্ব করে। বেরিয়ে আসতেই হবে সংস্কার তথা কুসংস্কারের এই বৃত্ত থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×