চার নেতা যেভাবে বিশ্বকে ওলটপালট করছেন
আন্তর্জাতিক
চা র নেতা বলতে আমি বলছি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা। তাদের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো– প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন, তাদের নেতৃত্ব অপরিহার্য। তারা ক্ষমতার জন্য যতদূর সম্ভব যেতে প্রস্তুত। তারা প্রত্যেকেই জনগণের কথা ভুলে শুধু নিজের স্বার্থে দেশের ভেতর ও বাইরে ব্যাপক সমস্যার জন্ম দিয়েছেন। যে কারণে দেশে তারা স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যেমন কঠিন করে তুলেছেন, তেমনি ভবিষ্যতের পথেও কাঁটা বিছিয়ে রেখেছেন।
২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাত্রার শুরুতেই পুতিন ভিন্ন রূপে দেখা দেন। এর আগে আগে রাশিয়ার ১০০ শহরে পুতিনবিরোধী বিক্ষোভ হয় এবং রাশিয়ার অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। অ্যারনের মতে, পুতিনের সমাধান ছিল– ‘শাসনের বৈধতা খুঁজতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিবর্তে সামরিক দেশেপ্রেমে।’ একই সঙ্গে তিনি খারাপ সব কিছুর জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ও ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করেন। পুতিন এইভাবে তাঁর মনন ও প্রচারে রাশিয়াকে অবরুদ্ধ এক দুর্গে পরিণত করেছিলেন। তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন– শুধু পুতিনই রাশিয়াকে রক্ষা করতে সক্ষম আর তাই তাঁকে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে হবে। তিনি রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিবেচনার চেয়ে মর্যাদার বিষয়কে প্রাধান্য দেন। এ জন্য অনেক ভুল পদক্ষেপও তিনি গ্রহণ করেন। যেমন, তাঁর যুক্তি– রুশ মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্য তাঁর ইউক্রেন আক্রমণ অনিবার্য ছিল।
চীনের প্রকৃত অবস্থা বেশ অপ্রত্যাশিতভাবে সম্প্রতি উন্মোচিত হয়। ১৯৭৮ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের পর আধুনিক ইতিহাসে চীন যে কোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি বোধগম্য, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধি লাভ করে। এর পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। তিনি শাসন ক্ষমতার মেয়াদের শর্ত বিলুপ্ত করেন এবং নিজেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রেসিডেন্ট বানান। শি আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাস করতেন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাঁর শক্তি হারাচ্ছে। এর ফলে ব্যাপক দুর্নীতির জন্ম হয়। সে জন্য তিনি সমাজ এবং ব্যবসার প্রতিটি স্তরে তাঁর শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে তিনি নির্মূলের নীতি গ্রহণ করেন। এর ফলে মাও সে তুংয়ের পর চীনে পরিবেশ আরও সংকীর্ণ হয়ে যায়। সম্প্রতি প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হঠাৎ নিখোঁজের ঘটনা এ ধারণাকে আরও পাকাপোক্ত করে।
আমি প্রায় পুরো জীবন বিদেশি শত্রুদের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়টি দেখে আসছি। অথচ এখানে আমাকে বলতে হবে, ইহুদি গণতন্ত্রের জন্য ভেতরকার শত্রু সবচেয়ে বড় হুমকি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বিচারিক অভ্যুত্থান ইসরায়েলের সমাজ ও সামরিক বাহিনীকে বিভক্ত করছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক ড্যান হারেল গত সপ্তাহে তেল আবিবের গণতন্ত্র র্যালিতে বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা সর্বোচ্চ খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেমনটা আগে কখনও দেখিনি’ এবং ইতোমধ্যে ‘ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর রিজার্ভ ইউনিটের মধ্যে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।’ এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো ছোটোখাট সমস্যা নয়। ইসরায়েল ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ওই অঞ্চলে আমেরিকা তাঁর সৈন্য ব্যবহার না করেই ইসরায়েলি ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে। ইরাক ও সিরিয়ার পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ার প্রচেষ্টা ইসরায়েল অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। এ অঞ্চলে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল প্রধান শক্তি।
যদি এই কট্টর নেতানিয়াহু সরকার আরও তিন বছর শাসন করে; তাদের যদি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরকে গ্রাস করার অভিলাষ থাকে এবং তাদের জাতিবিদ্বেষ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের সেখানে শাসন করে তবে অঞ্চলটিতে এই ইহুদি রাষ্ট্রটি সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ হবে।
২০২০ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেষ্টা হিসেবে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটলে হামলার ঘটনা আমরা দেখেছি। একই ব্যক্তির ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে রিপাবলিকানদের প্রধান প্রার্থী হওয়ার কারণে পরবর্তী নির্বাচনটি আমাদের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি অভিন্ন বিষয়ও এই চার নেতাকে একই সূত্রে গেঁথেছে। তা হলো, দেশের অভ্যন্তরে তারা ক্ষমতার জন্য সব নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। তা ছাড়া পুতিন বাইরের দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন। তার কারণও যে ক্ষমতায় থাকা– তা স্পষ্ট। তাদের দেশীয় দল বা প্রতিষ্ঠান তথা রুশ অভিজাত, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, ইসরায়েলি নির্বাচকমণ্ডলী এবং আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি তাদের কার্যকরভাবে কিংবা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তবে এই চারজনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প তাদের দেশে সংকটে পড়ছেন। ভোটাররা তাদের উভয়কেই ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে বা থামাতে পারে। শি স্বৈরাচারী; তাঁর ক্রমবর্ধমান শক্ত হাতের শাসন চীনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধা দিচ্ছে। আর পুতিন হলেন প্রেসিডেন্টের ছদ্মবেশে একজন মাফিয়া ডন। থমাস এল ফ্রিডম্যান: পুলিৎজারবিজয়ী লেখক ও কলামিস্ট; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
